কাগজ ফুল
Published by দেবোত্তম বণিক in প্রথম পর্ব, দ্বিতীয় সংখ্যা, অক্টোবর ২০২৫ · Friday 31 Oct 2025 · 5:00
Tags: ছোটোগল্প
Tags: ছোটোগল্প
কাগজ ফুল
দেবোত্তম বণিক
সন্ধ্যে আনুমানিক সাড়ে পাঁচটা। চৌরাস্তার এক কোণে
বিশাল কাগজফুলের গাছ, আর তার ঠিক নিচে রাখা বেঞ্চটিতে বসে আছে অপূর্ব। কাল তার জীবনের সবচেয়ে বড়
পরীক্ষা। এত বছরের কষ্ট, সাধনা আর সমর্পণের অন্তিম পর্ব। নানা দুশ্চিন্তা মাথায়
ভর করে আছে। বেঞ্চে হেলান দিয়ে চোখ দুটো বন্ধ করলো অপূর্ব। মিনিট দু-তিনও যায়নি, হঠাৎ
বেঞ্চের পেছন থেকে কপালে ঠেকলো দুটো শীতল ঠোঁট। চোখ খোলার সাথে সাথেই যেন হাওয়ার
ঝাপটা এসে ছুঁয়ে গেল, আর উপরের গাছ থেকে ঝরে পড়তে লাগল কাগজ ফুল। তারই মাঝখানে দাঁড়িয়ে তার সবচেয়ে প্রিয়
নারী— দেবযানী। কোমল ঠোঁটের ছোঁয়া যেন এক মুহূর্তেই মুছে দিলো সমস্ত ক্লান্তি ও
দুশ্চিন্তা। কী অপূর্ব না লাগছে ওকে! তার চোখ দুটি দেখে মনে হয়, যেন কোনো
শিল্পী নিপুণ হাতে এঁকে গেছে কারুকার্য। চুলগুলো আকাশের সাদা মুক্ত মেঘের
মতো—ঈশ্বর করুন, এগুলো যেন চিরকাল এভাবেই অবমুক্ত থাকে।
দেবযানী হেসে বলল—
"কি হে মশাই, কী ভাবছেন?’
চমকে উঠল অপূর্ব।
—"হ্যাঁ?’
ধমকের স্বরে দেবযানী আবার বলল—
"হ্যাঁ হ্যাঁ
করছো শুধু! কাল না তোমার ইন্টারভিউ? আজ এমন গোমড়া মুখ করে
বসে থাকলে চলবে?’
অপূর্ব দুটো হাত ধরে বেঞ্চে বসিয়ে দিল দেবযানীকে। ঠিক কতটা সময় যে কেটে গেল দু'জনের— তা কারও জানা নেই। কেবল ঝরে পড়া কাগজ ফুলই হয়তো সেই সময়ের অজানা হিসেব দিতে পারবে। হঠাৎ অপূর্বর চোখ ভরে উঠল অশ্রুরাশি। চোখের কোনের
বাঁধ ভাঙবে ঠিক তখনই দেবযানী দুহাতে আঁকড়ে ধরে তাকে
কাছে টেনে নিল। অশ্রু ঝরলো কিনা তা দেবযানীর জানা নেই, তবুও পরিস্থিতি এবং তার অপূর্বকে সামলাতে গম্ভীরতার আড়াল ভেঙে মজা করে বলল—
"ছেলেদেরও
আবার এমন ফেলফেল করে কাঁদতে আছে নাকি?’
হৃদয়ের গভীরতা থেকে মাথা তুলে অপূর্ব মৃদু অভিমান নিয়ে বলল—
"সবার হৃদয় তোমার মতো
পাথরের নয়।’
খানিকটা ভান করে অভিমানে
দেবযানী হাত ছাড়িয়ে নিলো—
"ও ছেলে, তবে আমার মন বুঝি পাথরের?’
হাসতে হাসতে অশ্রুকণা মুছে অপূর্ব বলল—
"না না, আমি তো তা বলিনি।’
রাঙা মুখ করে দেবযানী বলল—
"থাক, আর আদিখ্যেতা করতে হবে না। সব অপমানের শোধ আজীবন ধরে
তুলব —এই বলে রাখলাম।’
অপূর্বও হেসে উঠল—
"তাহলে তো
তোমায় এখন থেকেই বস্তাভর্তি অপমান করা উচিত, যাতে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত শোধ দিতে হয়।’
দু'জনের হাসিঠাট্টার মাঝে হঠাৎ
অপূর্ব নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে তাকে টেনে
নিল বুকে। সেই বুকে মাথা রাখতেই দেবযানীর সমস্ত প্রাণ যেন ভেঙে পড়ল তাসের ঘরের মতো। কিছুক্ষণ পরে ফিসফিসিয়ে বলল— "কাল চাকরিটা হয়ে যাবে তো?’
অপূর্ব মমতাভরা হাতে মাথায় ছোঁয়া দিলো—"আমার জন্য না হোক, তোর জন্য তো হবেই।’
দেবযানী চোখ মুছে বলল—
"পারবিই...
নিশ্চয়ই পারবি।’
অপূর্ব অবাক হল—কলেজ ক্যান্টিনের হাফ প্লেট চাউমিনে শুরু হওয়া ভালোবাসা এভাবে
এক সুন্দর জীবনের স্বপ্ন গড়ে দিতে পারে, তা কখনো
কল্পনাও করেনি।
হঠাৎ বেঞ্চ থেকে নেমে হাঁটু গেড়ে দেবযানীর হাত ধরে অপূর্ব বলল—
"বল তো, তোমার কী চাই?’
দেবযানী একটু এগিয়ে এসে মৃদু হেসে বলল—
"তোমাকেই।’
অপূর্ব হেসে মাথা নাড়ল—
"না, ইয়ার্কি নয়। ঐ সামান্য কটা কানের দুল ছাড়া তো কখনও কিছু দিতে পারিনি। বলো না, কী দেওয়া যায় আমার স্বপ্নের রানিকে?’
দেবযানী বলল—
"বেশি কিছু
চাই না। তোমার সাথে পুরো জীবন কাটানোর জন্য এই চৌরাস্তার যে কোনো এক গলিতে একটা
ছোট্ট বাড়ি চাই।’
অপূর্ব মজা করে বলল—
"তথাস্তু
মালকিন, তবে তাড়াতাড়ি বাড়ির নকশাটা তৈরি করে নিন।’
দেবযানী ঠোঁট ফুলিয়ে বলল—
"হয়েছে, এখন আর রাতবিরেতে রাস্তার ধারে তামাশা করতে হবে না। বাড়ি থেকে চাউমিন এনেছি, খেয়ে আমাকে ছুটি দাও।’
…ছোট্ট কয়েকটা কুকুরছানার ডাক ভেসে এলো। ভাবনা থেকে চমকে উঠল দেবযানী। কী সুন্দর! সেই
বেঞ্চেই একা বসে আছে সে। বাতাসে দুলছে কাগজফুলের গাছ, ঝরে পড়ছে শত শত মলিন ফুল। পার হয়ে গেছে দীর্ঘ দুটো বছর। কত কিছুই না বদলেছে— কিন্তু
শেষ পর্যন্ত কি বদলে গেল তার প্রিয় মানুষটাও?
আজ তাদের প্রথম বিবাহবার্ষিকী। সকাল থেকেই দেবযানী এক অদ্ভুত উচ্ছ্বাসে ভরে
উঠেছিল। রান্নাবান্না, ঘর পরিষ্কার, বাড়ি সাজানো— সব
নিজের হাতে করেছে। অপূর্বকে অনেক অনুনয় করে এবং কোন এক সারপ্রাইজ এর দোহাই দিয়ে রাজি করিয়েছে অন্তত আজকের দিনটা ওয়ার্ক ফ্রম
হোম করার জন্য। তবুও জানত, নামমাত্রই সে বাড়িতে থাকবে। আসলে তো ল্যাপটপেই ডুবে থাকবে।
দুপুরে যখন খাবার জন্য ডাকলো, তখনও শুধু
বলেছিল— ‘ইম্পরট্যান্ট মিটিং আছে, বিজনেস ডিলটা সাইন হলে ভালো অংকের মুনাফা হবে, বিরক্ত করো না।’
দেবযানী অবাক হয়েছিল। একদিন যে মানুষ প্রাণ দিয়ে তাকে আঁকড়ে ধরতে পারত, আজ সে কি এভাবে শুধুই টাকার লোভে লোভী? বুক কেঁপে উঠল।
দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যে
নামলো আবারো সাহস করে দরজার কাছে গিয়ে ডাকলো—
"অপূর্ব...
অপূর্ব...’
প্রথমে কোন উত্তর নেই। খানিক পরে ভেতর থেকে ভেসে এল রুক্ষ স্বর—
"চুপ মাগী! সকাল থেকে মাথা
খাচ্ছিস! দেখছিস না মিটিং এ আছি? অফিসে না
গিয়েই ভুল করেছি।’
চমকে উঠল দেবযানী। বুকটা যেন হিম হয়ে গেল। এ কি সেই অপূর্ব? চোখ ঝাপসা হয়ে এলো।
…আবারো কুকুরছানার ডাক। হুঁশে
ফিরল দেবযানী। মনে হলো, ছোট ছোট
প্রাণগুলোকে না ছুঁলেই নয়। রাস্তা পার হওয়ার জন্য এগোলো সে।
অন্যদিকে দীর্ঘ মিটিং শেষে বিজয়ীর হাসি নিয়ে লেপটপ বন্ধ করতে গেল অপূর্ব। হঠাৎ
চোখে পড়ল ব্যাকগ্রাউন্ড স্ক্রীন এ দেবযানীর ছবি। থমকে গেল। মনে পড়ল, কিছুক্ষণ আগেই কী ভয়াবহ ব্যবহার করল সে তার প্রিয়
মানুষের সাথে! লেপটপটা নামিয়ে রাখতেই চোখে পড়ল ফুলের তোড়ার পাশে রাখা একটা ছোট্ট জিনিস— প্রেগনেন্সি কিট। স্তব্ধ হয়ে গেল সে। আজকের সারপ্রাইজ এটাই ছিল— তাদের প্রথম
বিবাহবার্ষিকীতে দেবযানী জানাতে চেয়েছিল সে মা
হতে চলেছে?
অপূর্বর মাথা ঘুরে গেল। ছুটে বেরোল ঘর থেকে। গোটা বাড়ি তন্ন তন্ন করে খুজলো, না! দেবযানী
কোথাও নেই। তবুও সে জানে, কষ্ট পেলে
দেবযানী যায় কাগজফুলের গাছতলার বেঞ্চে।
সেখানে পৌঁছে দেখতে পেল রাস্তায় ভিড়। দু একজনকে
ঠেলে এগিয়ে গিয়ে দেখল, মাঝ রাস্তায়
পড়ে আছে কারো আঁচল। গাঢ় নীল রঙের আঁচলটা রক্তে ভিজে ধূসর হয়ে গেছে।
শিরদাঁড়া দিয়ে শীতল স্রোত বয়ে গেল অপূর্বর। আরও কাছে যেতেই বোঝা গেল— মানুষটা তার
খুব চেনা। চারপাশে ছড়িয়ে আছে শত শত কাগজ ফুল। এক কোণে
খেলা করছে দু'একটা কুকুরছানা...