Go to content

যাবজ্জীবন

উত্তরসূরি
Skip menu
উত্তরসূরি
সাহিত্য পত্রিকা
Skip menu

যাবজ্জীবন

New Project 2
যাবজ্জীবন
পার্থ রায়
রুমনার হাতে ধরা মোবাইলটা আবার বেজে ওঠে। নিলয়ের নাম্বার। অপেক্ষাক্লান্ত নিলয় অস্থির হয়ে উঠেছে। স্বাভাবিক, রুমনা পৌঁছয়নি ষ্টেশনে। সাড়াও দিচ্ছে না। আসলে রুমনার দুটো সত্তার লড়াই চলছে। অনবরত সে লড়াই। বাড়ি থেকে বের হবার সময় যে দৃঢ়তা নিয়ে বের হয়েছিল, যত হাঁটছে ততই যেন ওর দুটো পা ক্রমশ ভারী হয়ে উঠছে। দ্বিধা দ্বন্দ্ব, বিবেক দংশন জট পাকিয়ে একটা ময়াল সাপের মতো ওর পাদুটো জড়িয়ে ধরে চলার গতিকে মন্থর করছে। মনের এক সত্তা অনবরত বলে চলেছে, "রুমনা, কীসের দ্বিধা? কীসের দ্বন্দ্ব? মুক্তি পাওয়ার এই সুযোগ কেউ ছাড়ে? নিলয় তোকে ভালোবাসে। বিয়ে করবে। সুখে রাখবে। এখনো জীবনের অনেক বসন্ত বাকি। একদম ঠিক করেছিস।’ আবার অন্য সত্তাটা বড় নরম কিন্তু বড্ড দাগ কেটে বলছে, "রুমনা, বারো বছরের দাম্পত্য পায়ে ঠেলে, পঙ্গু স্বামীকে অসহায় অবস্থায় ফেলে কোথায় চলেছিস? কোন সুখের খোঁজে? যদি তোদের সন্তান থাকত? পারতিস? নিলয় রাজী হত সন্তান সহ তোকে মেনে নিতে?’ ভেতর থেকে আর একটা রুমনা ফুঁসে ওঠে, "নিলয় মোটেই অমন ছেলে নয়। নিশ্চয় আমাকে আমার সন্তান সহ মেনে নিত’। নাছোড়বান্দা ওই সত্তা আবার বলে ওঠে, "সেই পরীক্ষা নিলয়কে দিতে হয়নি। তোর যদি এমন দুর্ঘটনা হত? তোদের সন্তান হয়নি, সে তো প্রথমবার তুই চাকুরী করবি বলে গর্ভপাত করিয়ে নিলি। নির্ঝর কষ্ট পেলেও তোর ইচ্ছেতেই সায় দিয়েছে। পরেরবার তোর মিস ক্যারেজ হল। তারপরে ওর এই দুর্ঘটনা।’ রুমনা সেই বিরুদ্ধ সত্তার খোঁজ পেল না। পাচ্ছে না কোন পাল্টা যুক্তি। তাহলে? তাহলে কী?
    ইঞ্জিনিয়ার নির্ঝর কন্সট্রাকশন সাইটে ক্রেন থেকে পড়ে যায় অনেকটা নীচে। মাথায় সেফটি হেলমেট পড়া ছিল বলে প্রাণে বেঁচে যায় কিন্তু কোমরের নীচ থেকে অসাড় হয়ে যায়। হুইল চেয়ারে বন্দী হয়ে পড়ে নির্ঝর। দীর্ঘ চিকিৎসায় হয়ত সুস্থতা সম্ভব। নির্ঝর যে নারসিং হোমে ভর্তি হয়েছিল, সেখানেই নিলয়ের সাথে দেখা এত বছর পরে। স্কুলে রুমনার সিনিয়র। ভাল ছাত্র হিসেবে সারা স্কুলে ওর খ্যাতি ছিল। পরে নিলয় ডাক্তারি পড়তে চলে যায় মেডিক্যাল কলেজে। যোগাযোগটা আর থাকেনি। অনেকগুলো বছর কেটে গেছে। নির্ঝরের নিউরলজির ব্যাপারটা নিলয়ই দেখে। প্রথম দিকে নিয়মিত না পারলেও, ওর ব্যস্ততার মাঝে দিনে একবার ঠিক সময় বের করে নির্ঝরকে দেখে যায়। ওর পেশাগত দক্ষতা এবং আন্তরিকতায় প্রথম দিকে নির্ঝরের বেশ উন্নতি হচ্ছিল। নিলয় ঘন ঘন আসতে থাকে। ওদিকে নির্ঝরের মনের আকাশে সন্দেহের কালো মেঘ জমছে। ওর শরীরের ভাষা, চোখের দৃষ্টি পাল্টে যেতে থাকে। মাঝে মাঝে নিলয়ের সাথে অভব্য ব্যবহার করতে থাকে। নিলয় অবশ্য সেটা গায়ে মাখত না। স্বামীর অজ্ঞাতে রুমনা সসংকোচে ওকে বলেছে, "ওর ব্যবহারে তুমি কিছু মনে করো না, প্লীজ।’ নিলয় অভয় দিয়ে হেসে বলেছে, "নট অ্যাট অল। এই ধরনের পেশেন্ট ওই রকম রিঅ্যাকট করবে এটাই স্বাভাবিক। তাছাড়া.........’ অর্থপূর্ণ হাসি হেসে নিলয় ওর চোখে চোখ রাখে। রুমনার গালে অজানা গোধূলির লালিমা। লজ্জারুণ চোখে বলেছে, "যাও তো। খালি উল্টা পাল্টা কথা।’
      বছর ছয়েক ঘর করার পরে নিলয়ের বিয়ে ভেঙ্গে যায়। ওর স্ত্রী ঝিনুক বড় লোক বাপের একমাত্র প্যাম্পারড চাইল্ড। বাপের বাড়ীতেই পার্টি কালচারে বড় হয়েছে। নিলয়ও পেশাগত কারণে সেভাবে সময় দিতে পারত না। যখন সময় বের করে ঝিনুককে কাছে চেয়েছে, সে তখন পার্টিতে যাবার জন্য আয়নার সামনে। সন্তান চাওয়া নিয়েও স্বামী স্ত্রীর মধ্যে ছিল মতানৈক্য।       
    আর এদিকে নির্ঝরের পঙ্গু হয়ে যাবার পরে রুমনার জীবনে যেন সীতার অগ্নি পরীক্ষা শুরু হল। স্কুলের চাকুরীটা স্বেচ্ছায় ছেড়ে দিয়ে সব ভুলে নিজেকে নির্ঝরের সেবায় সঁপে দিল। পায়খানা পেচ্ছাপ থেকে শুরু করে সবই করিয়ে দিতে হয়। প্রথম দিকে সবই ঠিক ছিল, কিন্তু যত দিন যেতে লাগল নির্ঝর যেন কেমন পালটে যেতে থাকে। খিটখিট করে। কথায় কথায় খুঁত ধরে। সব সময় রুমনাকে ব্যতিব্যাস্ত করে রাখার একটা আপ্রাণ প্রচেষ্টা। নিলয়ের সাথে রুমনার সম্পর্ক বন্ধুত্বের সীমা ছাড়িয়ে ঘনিষ্ঠতার পর্যায়ে যাবার আগে থেকেই নির্ঝরের মনে সন্দেহের আনাগোনা শুরু। বিশেষ করে যখন শুনল যে ওরা একই স্কুলে পড়েছে এবং নিলয় ডিভোর্সি। তারপরে তো যতো দিন গেছে ওর অত্যাচারের মাত্রা বেড়েছে। ইদানিং নির্ঝর গায়েও হাত তুলছিল। কাছে গেলে হাত মুচকে দিত, খিমচে দিত। একটা হিংস্র নেকড়ের চাউনি নিয়ে নোংরা নোংরা কথা বলে। রাতে ভাল করে ঘুমোতে পারেনা রুমনা। জেগে ওঠে। এই বুঝি নির্ঝরের বেড প্যান দরকার পড়ল, এই বুঝি ও জল খেতে চাইল। দুপুরে আর রাতে কিছুটা সময় রুমনা একা নিজের মত করে পায়। এখনকার নির্ঝরের সাথে সে সময়ের নির্ঝরকে মিলিয়ে দেখে। আদর, সোহাগে ভরা সোনাঝরা দিন ছিল সেসব। কী প্রাণবন্ত আর রোম্যান্টিক ছিল নির্ঝর! সেসব পাগলামোর কথা মনে পড়লে চোখে জল নিয়েও হেসে ফেলে রুমনা। বড় মেদুর, মেরুন রাঙা দিন ছিল সেসব।
    আর এখন? ওর সন্দেহ আর অত্যাচার যতো বেড়েছে ততোই রুমনা অজান্তে নিলয়ের কাছাকাছি চলে গেছে। ক্রমশ হ্যামলিনের বাঁশীওয়ালার মতো নিলয় ওকে বসন্তের স্বপ্ন দেখিয়েছে। দিনের পর দিন অসীম ধৈর্য ধরে। রুমনার মন সায় দিচ্ছিল না।    
    ওর হাতে নখের দাগ দেখে নিলয় আঁচ করেছে। রুমনা কিছু বলেনি। একদিন প্রস্তাব দিয়েছে, "আমি চেন্নাইতে চলে যাব। একটা ভাল অফার পেয়েছি। আমি চাই তুমিও চলো। আমরা ঘর বাঁধব। সংসার করব আবার।’ শুনে এক সুখের শিহরণে কেঁপে উঠেছে রুমনা কিন্তু পর মুহূর্তে ওর অজান্তে মুখ থেকে বের হয়েছে, "নির্ঝরকে কে দেখবে? ও যে অসহায়। কী হবে ওর? মরে যাবে যে ও।’ নিলয় অভয় দিয়েছে, "আমি সব ব্যবস্থা করে যাব। ওর চিকিৎসার মনিটরিং, নার্সিং সব কিছুর দায় দায়িত্ব আমার। তুমি নিশ্চিন্ত থাকো। ভরসা করো আমাকে।’
    মাঝে মাঝে নিলয় শারীরিক ভাবে ঘনিষ্ঠ হতে চেয়েছে। রুমনাও কি চায় নি? ওর দীর্ঘদিনের অভুক্ত শরীরেও প্রবল তাগিদ বোধ করেছে। দীর্ঘশ্বাসে আর প্রবলতর মনের জোরে সেই ইচ্ছেকে দফন দিয়েছে। আজন্ম লালিত সংস্কারে শেষ মুহূর্তে চূড়ান্ত সীমারেখা লঙ্ঘন করতে দেয়নি। নিলয় হতাশ হলেও মেনে নিয়েছে।
    আবার ফোনটা বাজছে। স্ক্রিনে দৃষ্টি যেতে ওর বুকের ভেতরে কে যেন একটা হাতুড়ির ঘা দিল। নির্ঝরের নাম্বার। ও কি ভুল দেখছে? না, এতো সত্যিই নির্ঝরের নাম্বার। রুমনা যখন দুপুরে বের হয়, তখন তো ও ঘুমোচ্ছিল। তাড়াহুড়ো আর টেনশনে ফোনটা পাশে রেখে আসা হয়নি। তা নাহলে চার্জ দিয়ে ওটা সব সময় বিছানায় ওর পাশেই থাকে। ইস! ফোনের নাগাল পেতে গিয়ে পড়ে গেল না তো? নিলয়ের ঠিক করা নার্সের তো এখনও আসার সময় হয়নি। তাহলে?
    ফোনটা রেসপন্স করে কানে দিতেই নির্ঝরের অভিমানি স্বর, "আমি সব জানতাম, রুমি। তুমি যখন বের হচ্ছিলে আমি জেগে ছিলাম। ঠিক করেছ। কোন অন্যায় করোনি। বিশ্বাস করো আমি খুব খুশী হয়েছি। I'll take care of myself. চিন্তা করো না। ভাল থেকো।’ ফোনটা কেটে দিল নির্ঝর। পাগলের মতো চিৎকার করে উঠল রুমনা। রিং ব্যাক করল কিন্তু সাড়া পেল না।
ট্যাক্সি ড্রাইভার জিজ্ঞাসা করল, "ক্যায়া হুয়া ম্যাডাম? কোই প্রবলেম?’
"এক্ষুনি গাড়ী ঘোরান। যতো তাড়াতাড়ি। আমায় ফিরতে হবে’
    আবার ফোন বেজে ওঠে। চোখে জল। দৃষ্টি ঝাপসা। দ্বিধা দ্বন্দ্বের দোলাচলে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে দেখে নিলয়ের নাম্বার থেকে রিং হচ্ছে। ফোনের স্ক্রিন ক্রমশ আরও ঝাপসা হয়ে যেতে থাকে।


Created with WebSite X5
LOREM IPSUM
Lorem Ipsum
Dolor sit amet, 12
12345 Consectetur (Adipiscing)
+00 012 345 678  | +00 012 345 678 (fax)
info@example.com
BLOG
DESIGN
Back to content