ধূসর ধারাপাত
Published by সুস্মিতা ভট্টাচার্য in প্রথম পর্ব, দ্বিতীয় সংখ্যা, অক্টোবর ২০২৫ · Friday 31 Oct 2025 · 4:30
Tags: ছোটোগল্প
Tags: ছোটোগল্প
ধূসর ধারাপাত
সুস্মিতা ভট্টাচার্য
ঝরে যাওয়া বকুল ফুল গুলো কুড়োতে কুড়োতে হঠাৎ বকুল ফুলের গাছটার দিকে চোখ পড়ে
নয়নার। এই জায়গায় নয়নার ইচ্ছে ছিলো শিউলি ফুলের গাছ লাগাবে। শরতে যখন শিউলি ফুল
ফুটবে, তখন
শিউলির গন্ধে ভেসে সকাল বেলা বারান্দায় বসে তুলোর মতো জমে থাকা সাদা মেঘগুলোকে
ভাসতে দেখবে নীল আকাশে। হঠাৎ প্রেসার
কুকারের সিটির শব্দে সমস্ত ভাবনার ঘোর কেটে যায় নয়নার। আজকাল তার সকল ইচ্ছেডানা শব্দহীন তরঙ্গে যেনো ভেসে
যাচ্ছে কোন এক অজানা লোকে।
অমরেশ এখনো ঘুম
থেকে ওঠে নি। কিন্তু কুকারের সিটিতে যদি তার ঘুম ভেঙ্গে যায় সেই ভয়ে নয়না দৌড়ে
রান্নাঘরে ছুটে যাওয়ার সময় তার আঁচলের সকল বকুল ফুল মাটিতে লুটিয়ে পড়ে, সেদিকে তার খেয়াল
নেই। রান্নাঘরে সবজি কাটার দায়ে হঠাতই পায়ের আঙুলে হোঁচট খেয়ে রক্ত ঝরতে থাকে, নয়নার সেদিকেও
খেয়াল নেই, যদি
অমরেশ উঠে পড়ে তাহলে আবার তিন কাণ্ড বাঁধবে।
মালতির মা বাসন
মাজতে এসে দেখে রান্নাঘরে রক্তের দাগ। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে নয়নার পায়ের
আঙ্গুলে সাদা কাপড়ের উপরে রক্তের চিহ্ন
দেখতে পায়। আঁতকে উঠে বলে, ‘এমা কী হয়েছে গো? অনেকটা কেটেছে
তো। বিকেলে ডাক্তার দেখাতে হবে কিন্তু।' ততক্ষণে অবশ্য অমরেশ ডাইনিং টেবিলে বসে
তড়িঘড়ি করে ব্রেকফাস্ট সারছে, কারণ আজ তার অফিসে আধ ঘন্টা আগে পৌঁছোতে হবে। মালতির
মায়ের সব কথাই অমরেশের কানে গেলো কিন্তু তার কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই। এদিকে নয়নার
পায়ের সাদা কাপড় ক্রমশ আরো লাল হয়ে উঠছে। ধীরে ধীরে আবার রান্নাঘরের মেঝে ভিজতে
শুরু করেছে রক্তে। রান্নাঘর থেকে ডাইনিং হল, ডাইনিং থেকে
ড্রয়িং রুম,
ড্রয়িং রুম থেকে খোলা আকাশের বকুলতলায় ঠিক যেভাবে মেয়েরা তাদের অস্তিত্বহীন
ঠিকানা বদলাতে বদলাতে একদিন শেষ বাদলঘন ঠিকানায় পৌঁছে যায়।
অমরেশের কোন
দিকে খেয়াল নেই। যদিও সে স্বভাবত বেখেয়ালি নয়। যাবার সময় নিজের বউয়ের দিকে একবার
ঘুরেও তাকালো না। এত রক্তের দাগ অমরেশ কী
দেখেও দেখলো না?
রক্তও কি আজকাল তাকে আঁতকে ওঠায় না? মালতির মা অবশ্য এ বাড়িতে প্রায় আট
বছর। নয়না কখনো কখনো মালতির মা, কখনো আদরের বুলডগ ব্রুনো, কখনো আকাশের
মতো শৈশবের নিজেকে খুঁজতে চেষ্টা করে ।
আজ দুধওয়ালা
রামু আসতে এত দেরি কেনো করছে? দুপুর
বারোটার দিকে দুধ দিয়ে যায়, কিন্তু আজ তো বেলা গড়িয়ে প্রায় শেষ। তাহলে কি রামু
আজ আসবে না?
এদিকে অমরেশ আজ আবার একটু তাড়াতাড়ি আসবে। কারণ রাতে কলিগের বিয়ের রিসেপশন
পার্টি। অফিস থেকে ফিরে এসেই ঘরে তৈরি ছানা খাওয়ার অভ্যেস অমরেশের। না পেলে আকাশ
পাতাল। কিন্তু রামু দুধ দিয়ে না গেলে ছানা কোথা থেকে হবে। নয়নার কাটা আঙুলটা
ব্যথায় টনটন করছে। বোধহয় টিটি নিতে হবে। ঠিকমতো হাঁটতেও পারছে না। ভয়, টেনশন সব
মিলিয়ে এক অদ্ভুত জগত সৃষ্টি হয় নয়নার মনে। কোনরকম খোঁড়াতে খোঁড়াতে বারান্দায়
এসে বসে নয়না। সন্ধ্যের আকাশে রাঙা মেঘ সাঁতরে নীড়ে ফেরা কিছু পাখিকে দেখতে পায়
সে। এক অমোঘ টানে তারা ঘরে ফিরছে। হয়তো স্বজন মিলনের আশায়, হয়তো নিজের
অপত্যের মুখে দুমুঠো খাবার দেবার তাড়ায়। তাদের জন্যও তো কেউ অপেক্ষা করে থাকে
ঘরে। আজ হয়তো নয়নার কোলেও কোনো ছোট্ট আশা বুক বেঁধে থাকত যদি না গত বছর অমরেশের
অপ্রত্যাশিত প্রহারে নয়না পড়ে না যেতো...।
অমরেশ কি
সত্যিই আজ খেয়াল করেনি সারা ঘরে নয়নার আঘাতের চিহ্ন? ফোন করে
ব্রুনোর খবর নিলো, কিন্তু যে তার সব স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষাকে
বিসর্জন দিয়েছে সেই নয়নার কথা একবারও জিজ্ঞেস করেনি। সম্ভীত ফিরলো দুধওয়ালা রামুর
সাইকেলের বেল রিঙে। কখন সন্ধ্যা হয়েছে নয়না খেয়াল করেনি। রামুকে দেখে একটু
আশ্বস্ত হলো। যাক এবার ছানাটা তোলা যাবে। ছানায় ভরবে মন অমরেশের। নয়না শুধু
তাকিয়ে তাকিয়ে দেখবে অমরেশের সন্তোষকে। যদিও হাফ চামচ ছানা ও উঠবে না ওর জিভে।
‘রামুদা এত দেরি করলে কেনো’? নয়না জিজ্ঞেস
করে। উত্তরে রামু যা বললো তাতে নয়নার ভাঙ্গা মনে যেনো কেউ সজোরে আঘাত করলো। রামুর
স্ত্রী নাকি আজ বাজারে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে যায়। স্ত্রীকে নিয়ে এতক্ষন হাসপাতালে
ছিলো রামু। স্ত্রীকে একটু সুস্থ করে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে রেখে তবেই দুধ দিতে বের
হলো সে।' দিদিমনি
হামার ঘরের লক্ষ্মী কে অসুস্থ রেখে কেমনে বের হবক বল দেখি'? --- নয়নার চোখে জল।
একটা প্রদীপের নিচে বাস করা মানুষ যার কাছে তথাকথিত সভ্যতা, বোধ, প্রেম সেভাবে
পৌঁছতে পারেনি সেও তার জীবন সঙ্গীকে মানুষ ভাবতে পারে। কিন্তু অমরেশ জানেনা, জানতে চায় ও না
নয়নার বেদনাকে। নয়নার মতো মানুষগুলো অভিমানের পর্দার আড়ালে নিজের অসহায় হৃদয়কে
প্রতিমুহূর্তে চোখের জলের ওড়নায় ভেজায়। অবজ্ঞা তাদের নিত্য সঙ্গী, অভিমানের ভেলায়
চড়ে তারা যাত্রা করে প্রতিনিয়ত কোন এক অজানা ঠিকানায়। আজ নয়নার অস্তিত্ব রামুর স্ত্রী থেকেও গৌণ। নয়নার চোখের
জল আর পায়ের ব্যথায় লুকিয়ে থাকে অসংখ্য নয়নার অস্তিত্ব সংকট। নিজেকে গড়ে তোলার
পর নিজেকে হারিয়ে ফেলার বেদনার অস্ফুট রিন রিন শব্দ। নিয়ত বুকের ভেতরে অস্তিত্ব
বিলুপ্তির দ্রিমি দ্রিমি ঝংকার। কিন্তু সেই ব্যথার বাণীও অব্যক্ত। কে শুনবে? শুনেই বা কি
করবে? শুনলেও
হয়তো কোন এক অনিন্দিতা বলবে ‘ওগুলো বুঝলি তো একটু মানিয়ে নিতে হয়। এসব আবেগের আজ
আর কোনো মূল্য নেই। আবেগ বর্জিত হতে চেষ্টা কর। দেখছিস না আমি যখন হায়দ্রাবাদে
পড়তে গেছিলাম সমস্ত আবেগ ঝেড়ে ফেলে এসেছি, দিব্যি আছি,কুছ পরোয়া
নেহি। বাঁচতে গিয়ে নিজেকে দেখ! বোকা একটা।'
নয়না
নিষ্পলক দৃষ্টিতে রাতের আকাশের দিকে
তাকিয়ে থাকে। নয়নার চিবুক বেয়ে গড়িয়ে পড়া ভেজা কাজল আর রাতের আকাশের
অন্ধকারের মধ্যে তৈরি হয় অনন্ত ভাসান যাত্রা।