দুঃস্বপ্ন ২০
Published by সঞ্জয় রায় in প্রথম পর্ব, প্রথম সংখ্যা, জুলাই ২০২৫ · Thursday 31 Jul 2025 · 2:30
Tags: অণুগল্প
Tags: অণুগল্প
--অণুগল্প--
দুঃস্বপ্ন ২০, সঞ্জয় রায়
টেলিভিশন, রেডিও,
ফেসবুক জুড়ে কোভিড-১৯ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। মানুষের শরীর-মন
জুড়ে অব্যক্ত মৃত্যুভয়। বিশ্ব জুড়ে আক্রান্ত আর মৃতের গ্রাফ শ',
হাজার, লক্ষ,
কোটি ছাড়িয়ে যাচ্ছে। আতঙ্কে রাস্তাঘাট বাজার শূন্য।
অবিশ্বাস গিলে খাচ্ছে একান্ত কাছের সম্পর্ক। মানুষ সিধিয়ে যাচ্ছে গোপন নির্জনে।
বৃথা নিরাপদ আশ্রয় খুঁজছে।
আমরা তিনজন ঘর বন্দি। তবু আমাকে বাইরে যেতে হয় টাকা তুলতে,
বাজার করতে, ওষুধ কিনতে। বউ-মেয়েকে ঘরে রেখে বাইরের কাজ আমি সামলাই ভাবি আমার কিছু হবেনা,
আর আমার হলে ওদেরও যে হবে। ছড়িয়ে থাকা প্রিয়জনের আক্রান্ত
হওয়ার,
হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার এমনকি চলে যাওয়ার খবর পাই। মন খারাপ
হয়,
মৃত্যু-ভয় বাড়ে। ভাবি তিনজনের একজনও চলে গেলে সইব কেমন করে।
আবার ভাবি “তিন জন একসঙ্গে গেলে মন্দ
হয় না।" ভাবি নিকট বন্ধু,
যাঁদের আমি ভালবাসি, যারা মিশে আছে আমার যাপনে, তাঁদের কেউ চলে গেলে সইব কেমন করে।
এক সকালে কমরেড বিষ্ণুর চলে যাওয়ার খবর পেলেম। আমরা কলেজে
একসঙ্গে রাজনীতির পাঠ নিয়েছিলাম। মুষড়ে পড়লাম, ভয় পেলাম। ভাবলাম, আমিও যেতে পারি যে কোনো দিন, না চাইলেও।
এক সন্ধ্যায় অমিয়র চলে যাওয়ার খবর পেলাম। ও আমার স্কুলের
বন্ধু ছিল,
আমাদের ক্লাবের ফুটবল দলের স্টার স্ট্রাইকার ছিল। আমি ছিলাম
স্টপার। ওর বউ সুধা আর মেয়ে অঙ্কিতার মলিন মুখ ভেসে উঠলো। খুব ইচ্ছে হল ওদের কাছে
ছুটে যাই,
অন্তত শ্মশানে যাই। এক অব্যক্ত ভয় আমার শরীর-মন অসার করে
দিল। ভেতরে ভেতরে ছটফট করলাম আর কাপুরুষ ‘আমি’-কে ধিক্কার জানালাম। রাতে ভাল করে খেতে পারলাম না।
দুশ্চিন্তা বাড়তে লাগলো “আমিও যদি..."।
শোয়ার পরে অন্ধকার ঘরে ছটফটানি আরও বাড়তে লাগলো। কিছুতেই
ঘুম আসছিল না। দু'বার উঠে বাথরুম
গেলাম। জল খেয়ে শুলাম তাতেও লাভ হল না। ছটফট করতে করতে ভোরের দিকে কখন চোখ ধরে
এসেছিল। আমি এক দুঃস্বপ্নে ভাসলাম:
ঝোপ-ঝাড়-জঙ্গলে ঘেরা উঁচু-নিচু মৃত্তিকা স্তর। পাশ দিয়ে বয়ে
গেছে পাহাড়ি নদী। পাশে আমাদের গ্রাম, আমাদের কুঁড়েঘর। আমি হত দরিদ্র কৃষক, নিজের অল্প জমি চাষ করি। অন্যের জমিতে জন মজুরি করি যখন ঘরে চাল ফুরিয়ে যায়।
ঘরে একটা দুধেল গাই, ক'টা হাঁস মুরগি; আমার বউ মায়া দেখাশোনা করে।
বিকেলের রোদ পড়ে এসেছে। আমি ওপারে ধান খেতে কাজ সেরে ঘরে
ফিরছি। সবে নদী পেরিয়েছি, দেখি নদীর বালুচরে এক শীর্ণ বৃদ্ধ মরে পড়ে আছে। খালি গা,
পরণের মলিন ধুতি অনেকটা খোলা। অদূরে শ্মশান। কাছে যেতে চমকে
উঠে দেখি আমার বাবা। শুকনো যন্ত্রণামাখা খোঁচা খোঁচা পাকা দাড়ি-মুখ,
আমার দিকে পিচুটি চোখে তাকিয়ে। ক'দিন ধরে করোনায় ভুগছিল। প্রচণ্ড জ্বরে আজ সকালে একবার জ্ঞান
হারিয়েছিল। বাবা তো বাইরের ঘরের বারান্দায় ছিল। মায়া মুখে কাপড় বেঁধে ভাতের থালা
দিয়ে আসতো। আমি ওদিকে যেতাম না। আমাদের মেয়েকেও যেতে দিতাম না। তবে বাবা এখানে এলো
কী করে?
হয়ত নিজেই এসেছিল আমাদের নিরাপত্তার কথা ভেবে। আমি বাবার
কাছে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসলাম। আদরে দু'হাতে বাবাকে তুলতে যাব এমন সময় পেছন থেকে আমার সাত বছরের মেয়ে ঝিমলি ডেকে উঠলো
“বাবা-আ-আ...”। আমি উঠে দাঁড়ালাম।
স্থাণুর মত দাঁড়িয়ে রইলাম। ধীরে ধীরে সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এল।