Go to content

সাক্ষাৎকার: ভগীরথ মিশ্র এবং কবি-প্রাবন্ধিক ড. তপোধীর ভট্টাচার্য

উত্তরসূরি
Skip menu
উত্তরসূরি
সাহিত্য পত্রিকা
Skip menu

সাক্ষাৎকার: ভগীরথ মিশ্র এবং কবি-প্রাবন্ধিক ড. তপোধীর ভট্টাচার্য

New Project 2
সাক্ষাৎকার
উত্তরসূরি আয়োজিত সাহিত্যিকের মুখোমুখি অনুষ্ঠানে অন্তরঙ্গ আলাপচারিতায় সময়ের একজন অগ্রগণ্য ঔপন্যাসিক এবং বঙ্কিম পুরস্কারপ্রাপ্ত বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক ভগীরথ মিশ্র এবং  কবি-প্রাবন্ধিক ড. তপোধীর ভট্টাচার্য অনুষ্ঠানটির অনুলিখন করেছেন জয়িতা এস্
ড. বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য: আজকে আমাদের মধ্যে রয়েছেন বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত লেখক বঙ্কিম পুরস্কারপ্রাপ্ত সাহিত্যিক ভগীরথ মিশ্র, তার সাথে রয়েছেন বরাক উপত্যকা তথা শিক্ষাজগতের একজন গুণী ব্যক্তিত্ব আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য, প্রাবন্ধিক, সাহিত্যিক ড. তপোধীর ভট্টাচার্য। ভগীরথ মিশ্রের জন্ম ১৯৪৭ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি পশ্চিম মেদিনীপুর জেলায়, যদিও তখন পশ্চিম মেদিনীপুর অখন্ড ছিল। চাকুরি জীবনে তার বিস্তর অভিজ্ঞতা রয়েছে তিনি বি.ডি.ও ছিলেন এবং এই বিস্তর অভিজ্ঞতাকে মিলিয়ে তার একটা বিখ্যাত উপন্যাস রয়েছে, সেই বিখ্যাত উপন্যাস হচ্ছে ‘আমলাগাছি'। তাঁর আরেকটা বিখ্যাত জায়গা আছে, জাদু শেখা, জাদু শেখানো ও জাদু দেখানো। তিনি মালেশিয়া, ইংল্যান্ড এবং আসামের নামরূপ, নাহারকাটিয়া, দুলিয়াজান প্রভৃতি বিভিন্ন জায়গায় অনেক সময় জাদু দেখিয়েছেন এবং ১৯৯৭ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত জাদুকর এস. কুমারের কাছে জাদু শিখেছেন। আমার সৌভাগ্য বেশ কয়েক বছর আগে যখন তিনি শিলচরে এসেছিলেন তখন আমারও তাঁর জাদু দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। তিনি দীর্ঘদিন বনসাই নিয়ে চর্চা করেছেন এবং তার উপর ‘বনসাই চর্চা' নামে একটি বিখ্যাত গ্রন্থ লিখেছেন। এছাড়াও কুটুম-কাটাম নিয়েও তিনি দীর্ঘদিন কাজ করে চলেছেন, কুকুর পোষাও তার একটা নেশা। এখন পর্যন্ত তার উপন্যাস সংখ্যা চৌদ্দ, গল্প লিখেছেন আড়াইশো-এর অধিক, হাসির গল্পসংকলন নিয়ে রয়েছে চারটি, ভ্রমণকাহিনি আটটি, কিশোর উপন্যাস এবং অন্যান্য কিশোরদের জন্য গল্প মিলিয়ে রয়েছে তেরোটি। তাছাড়া তাঁর বিখ্যাত উপন্যাসগুলোর অন্যতম হচ্ছে ‘মৃগয়া' যেটি পাঁচখন্ডে রচিত, ‘অন্তর্গত নীলস্রোত', ‘তস্কর', ‘আড়কাঠি', ‘চারণভূমি', ‘জানগুরু', ‘অমানুষনামা', ‘ঐন্দ্রজালিক', ‘জাদুগর' প্রভৃতি উপন্যাস। ‘ঐন্দ্রজালিক' এবং ‘জাদুগর' তার জাদু নিয়ে যে চর্চা তার উপর তিনি লিখেছেন। অসংখ্য সম্মান পেয়েছেন তিনি, তারমধ্যে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ প্রদত্ত ‘বঙ্কিম পুরস্কার' যেটি ‘মৃগয়া' উপন্যাসের জন্য, সর্বভারতীয় কথা, সমরেশ বসু স্মৃতি পুরস্কার পেয়েছেন ‘আড়কাঠি' উপন্যাসের জন্য, ‘তারাশঙ্কর' পুরস্কার পেয়েছেন নির্বাচিত গল্পগ্রন্থের জন্য, গল্পমেলা পুরস্কার পেয়েছেন ‘লেবারণ বাদ্যিগর’ গল্পগ্রন্থের জন্য। তাছাড়া অন্যান্য যে স্বীকৃতি রয়েছে তারমধ্যে তার ‘মৃগয়া' উপন্যাসের উপর তিনদিন একটা আলোচনাচক্র হয়েছিল জার্মানির হাইডেলবার্গে। তার লেখা নিয়ে এখন পর্যন্ত দুটো পি.এইচ.ডি হয়েছে, তিনটি এম.ফিল হয়েছে আসাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, আরো সাতটা এম.ফিল রয়েছে। তার মধ্যে আমার যেটা সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি তাঁর ‘মৃগয়া' উপন্যাসের উপর আমি গবেষণা করেছিলাম এবং ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেছিলাম। তার যে গল্পগুলি রয়েছে তা বিশটি আঞ্চলিক ভাষায় অনুদিত হয়েছে। ভগীরথ মিশ্রের অনেকগুলি গল্পের টেলিফিল্ম তৈরি হয়েছে। ‘আড়কাঠি' উপন্যাস সিনেমা হওয়ার পথে।
ড. তপোধীর ভট্টাচার্য: শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের একটি পংক্তি দিয়ে শুরু করি যেটা আমার মনে পড়ছে এই মুহূর্তে ‘সময়ের বুক থেকে ধাক্কা মোচন করে রোজ তীর্থঙ্কর সে কি আমি'- এই যে কথাটি এই কথাটির তাৎপর্য যেন নতুনভাবে বুঝতে পারি যখন এই মুহূর্তে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম পুরোধা কথাসাহিত্যিক ভগীরথ মিশ্রের বই-এর মুখোমুখি হই, যখন ভগীরথের ছোটগল্প যা কার্যত বিপুল ঐশ্বর্যময় ভান্ডার তার মুখোমুখি হই কিংবা যে উপন্যাসগুলোর নাম শ্রীমান বিশ্বজিৎ বলে গেল পড়ুয়া হিসেবে যখন তাদের মুখোমুখি হই। সত্যিই তো সময়ের বুক থেকে যে ধাক্কামোচন করে যাচ্ছেন তিনি এবং আমাদের সবার জন্য আমরা যারা পড়ুয়া আমাদের জন্য দিয়ে যাচ্ছেন অতীতের নানা স্বাদ সেই ভগীরথ মিশ্রকে তিনি আমার ব্যক্তিগত স্তরে বন্ধু বা বটে আমি তাকে আমার নিজের তরফ থেকেও স্বাগত জানাচ্ছি আজকের এই আলোচনায়। আমি এই আলোচনায় আমার ভূমিকা নিতান্ত সূত্রধারের আর যারা সংস্কৃত নাটক খানিকটা অনুবাদ করেছেন তারা জানেন যে নান্দি হওয়ার পরে সূত্রধারের প্রবেশ ঘটে, তারপর সূত্রধার ঐ তার কাজ করে দিয়ে সে বেরিয়ে যায় বাকী কাজ অন্যরা করেন যারা কুশীলব এখানে একমাত্র কুশীলব হচ্ছেন ভগীরথ মিশ্র, তবে সংস্কৃত নাটকের যেমন সূত্রধার মাঝে মাঝে এসে রসভঙ্গ করেন না এখানে তার ব্যতিক্রম ঘটবে অর্থাৎ আমি মাঝে মাঝে এসে একটু দু-চারটে কথা বলব এবং এতে ভগীরথের কন্ঠও বিশ্রাম পাবে এবং ভগীরথও হয়তো বা পর্বান্তরে চিন্তায় যেতে পারবেন। ভগীরথ মিশ্র সম্বন্ধে বলা আমার পক্ষে ভীষণই সহজ সেইজন্যই কিন্তু একই কারণে অত্যন্ত কঠিন! কারণ নিজের কররেখাকে যেমন খুব ভালোভাবে নিজে চেনা যায় তেমনি যাকে বহুবছর ধরে বন্ধু বলে জেনেছি এবং যতোদিন গেছে তার সঙ্গে সম্পর্ক গাঢ়তর হয়েছে তার সম্পর্কে নিশ্চয়ই বলা যাবে খুব সহজে আবার সেইজন্যই হয়তো অনেককিছু থেকে যাবে যেটা আমার ভাবনার বাইরে থেকে যাচ্ছে, তো ভগীরথ মিশ্রের সঙ্গে কিছু ব্যক্তিগত কথা বলার লোভ সামলাতে পারছি না, আমার প্রথম পরিচয় হয় এক বিচিত্র এক সাহিত্যের আসরে কোনো এক সকালবেলা, শহরটার নাম বালুরঘাট এবং সেখানে আজ থেকে তিরিশ বছর আগে আমি তখন উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াই আর ভগীরথ তখন এক ডাকসাইটে আমলা। তিনি এসেছিলেন আমলা হিসেবে নয়, সেইসময়ে যখন তিনি বালুরঘাটে আসেন আমাদের সবারই শ্রদ্ধেয় এক ব্যক্তি যাকে আমরা মধুদা বলে ডাকতাম, মধুদা তার নাম না ‘মধুপর্ণী' পত্রিকার সম্পাদক অজিতেশ ভট্টাচার্য মশাই অত্যন্ত স্বজ্জন এবং তিনি পঁচিশ বছর পূর্তি উপলক্ষে তার পত্রিকার এই আয়োজন করেছিলেন সেখানেই আমার প্রথম তার সঙ্গে পরিচয় এবং দুদিনের মাথায় সম্পর্কটা খুব গাঢ়তর হয়ে উঠে। আমি ছোট্ট একটা গল্প না বা গল্পের মতোই আমি যখন সকালবেলা একটু ভোররাতে বা ভোররাত্রে কী শেষরাত্রে পৌঁছেছি, তারপর খানিকক্ষণ বিশ্রাম করে নীচে গেছি আমার সঙ্গে আমার গৃহিণীও ছিলেন স্বপ্না ভট্টাচার্য তার সঙ্গে নীচে গেছি দেখি একজন মানুষ বিশাল আসর জমিয়ে বসেছে তার চারদিকে মানুষ হেসে গড়িয়ে পড়ছে তো সেখানে যেতেই যেতেই কানে এল যে ভগীরথ গল্প করছে, আর ভয় নেই বিপদ এসে গেছে; এটা ভারী মজার ব্যাপার একজন আমাদের বন্ধুস্থানীয় বিপদভঞ্জন সরকার তার নাম, ভগীরথ তার প্রভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে বলছে যে আমি তো সামনে হকচকিয়ে উঠলাম ঘুমাচ্ছিলাম হঠাৎ শুনি তারস্বরে আওয়াজ যে, আর ভয় নেই বিপদ এসে গেছে, ওরে বাবা রে! বিপদ এসে গেছে ভয় নেই মানে কী? মানে বিপদভঞ্জন সরকার এসে গেছে, তারপর তো...ঐ হচ্ছেন ভগীরথ।
যে ভগীরথকে ক্রমশঃ জেনেছি যখন সেখানে গেছিলাম তখন ‘রাবণ' নামে তার একটি গল্প যা অত্যন্ত বিখ্যাত একটি গল্প এবং ভগীরথ মিশ্রকে চিনিয়ে দিয়েছিল আমাদের কাছে বিশেষ করে আমার এবং স্বপ্না ভট্টাচার্যের কাছে। সেই ‘রাবণ' গল্প পড়ে গেছি এবং আরো কিছু গল্প পড়েছি যা জাইগেনশিয়া অন্যান্য গল্প যেটা প্রথম ‘অমৃতলোক' থেকে বেরিয়েছিল যেখানে যে পত্রিকার মাধ্যমেই আমার পরিচিতি বাংলা সাহিত্যের বিপুল সংসারের সঙ্গে। সমীরণ মজুমদার এখন নেই, তাঁর পত্রিকা ‘অমৃতলোক'-এর মাধ্যমে এবং তার পর পরই বেরোচ্ছে বোধহয় ১৯৮৯ সাল ছিল তারপরে অবশ্য ‘লেবারণ’ বাদ্যিগর বেরিয়েছে যেটা অবশ্য তার সঙ্গে আমার দেখা হওয়ার পরে, লেবারণ বাদ্যিগর যেটা একটু আগে বিশ্বজিৎ বলেও গেল যে এটা সোপান পুরস্কার সম্ভবতঃ সেটা পেয়েছে। তো অনেক পুরস্কার আমার বন্ধু কথাসাহিত্যিক ভগীরথ মিশ্র পেয়েছেন সেই পুরস্কারের হিসেব নেই, কিন্তু আমি পুরস্কারের দিকে যাচ্ছি না। যে কথাকার ভগীরথ মিশ্র আমাদের এতো প্রিয় তাকে যদি উন্মোচন করতে চাই, আড়াইশোর মতো গল্প তিনি লিখেছেন, তার এইসব গল্প সংকলনগুলো একাধিকবার তো বটেই; যেটা অন্তত পাঁচ-ছ বার করে পড়েছি, বারবার পড়েছি, কোনো কোনো গল্প অসংখ্যবার পড়েছি, তারমধ্যে একটা যেমন ‘রাবণ', ‘সুবচনী’, ‘পুত্রেষ্টি’ এগুলো বাংলা সাহিত্যের সত্যিকার অর্থে বলা যায় যে মাইলষ্টোন, মাইলফলক। তো সেই মাইলফলক গল্প তার অনেক আছে, তার ঐ যে ‘লেবারণ বাদ্যিগর' বললাম তারপরে তার যে গল্পসংকলনগুলো ক্রমশঃ বেরোলো এরমধ্যে রয়েছে যেটা আমাকে প্রথম আমার কাছে বার্তা দিয়েছিল যে ভগীরথ মিশ্র নিজেকে রূপান্তরিত করে চলেছেন, প্রথমটি হচ্ছে ‘কাকচরিত্র গল্পসংকলন’ এবং তার ঠিক পরপরই পড়েছিলাম ‘চিকনবাবু’। আরো বেশ কিছুদিন পরে তার গল্পসংকলন বেরিয়েছিল ‘মিট ফিল্ডার’, পরে আরো বেরিয়েছে কিন্তু এই যে কতগুলো গল্পসংকলন বললাম প্রথম দুটি গল্পসংকলনে যদি আমাদের ভগীরথ তার প্রস্তুতিপর্ব দ্রুত সমাধান করে থাকে তারপরে অতি দ্রুত সে পরিণতির দিকে এগিয়ে গেলো। ‘পুত্রেষ্টি’, ‘সুবচনী’ গল্পগুলির মধ্যে যে মাহাত্মটা কোথায়? সেটা আমিই যদি সব বলে দিই তাহলে তো মুশকিল। ধরুন আরেকটা কবিতা বলি কবি মহম্মদ শারীর ওর বাড়ি ঢাকায়, ঢাকায় না, বাড়ি সুনামগঞ্জে কিন্তু থাকেন ঢাকায়; যাই হোক ওর একটা চার পংক্তির কবিতা আমার মনে পড়ছে- "মানুষ জন্মগ্রহণ করে/ কারণ নদী হওয়া ছাড়া তার ভিন্ন কোনো বাসনা নেই/ মানুষ জন্মগ্রহণ করে/ কারণ মাটি হওয়া ছাড়া তার কোনো নিয়তি নেই।’ ভগীরথ মিশ্র বহমান নদীর মতো বয়ে চলেছেন আমাদের বিস্তৃত করে চলেছেন আর মাটিতে ফিরে যাচ্ছেন মানে তিনি আকাশবিহারী নন। হ্যাঁ ‘ঐন্দ্রজালিক’ অনেক আগেই ভগীরথ আমায় উপহার দিয়েছিলেন কিন্তু এইবার এই অতিমারিতে লাভটা হয়েছে আমার, ‘জাদুগর’ অবশ্য কয়েকমাস আগে পেয়েছিলাম এই দুটো আমার অপঠিত ছিল, এইবার অতিমারিতে এই লাভ হয়েছে যে দুটো বই বা বলা যায় মহাউপন্যাস, যে জাদুকর জাদু দেখাতে ভালোবাসেন এতো বলেই গেলো বিশ্ব, এটা বললে তো কিছুই বলা যায় না। জাদু একটা সংস্কৃতি সেই জাদু সংস্কৃতির যে বিপুলায়তন ইতিহাস আছে এবং সেই ইতিহাসের যে অনেকগুলো শাখা-প্রশাখা আছে এই সবকিছুর কতটুকু বিপুল পরিমাণ অধ্যবসায় করলে অধ্যবসায়ের মাধ্যমে তারপরে এইধরণের দুটো বই লেখা যায়, এবং তারমধ্যে সেটা নিয়ে প্রকৃতপক্ষে আমি কাকে যেন বলছিলাম দু-তিনদিন আগেই যে এটা হয়তো আমি কোনো একদিন বিশ্বজিৎ-কেই বলব একটি বিশেষ পাঠককৃতি যাকে আমি বলি বা বয়ান বা text এটা নিয়েই একটা আলাদা আলোচনা হওয়া উচিত।
   আমাদের ভগীরথ হচ্ছেন নিজে স্বয়ং নদী, আমাদের ভগীরথ হচ্ছেন সেই লেখক যিনি জমির সঙ্গে আকাশের দ্বিরালাপ সতত সন্ধান করেন। এইবার সঞ্চালকের ভূমিকায় ফিরে আসি এই যে আমি উপন্যাসে পরে আসছি, ‘অন্তর্গত নীলস্রোত' প্রথম পড়ি তখন আমি উত্তরবঙ্গেই ছিলাম ‘তস্কর'-টাও বোধহয় উত্তরবঙ্গে থাকার সময়ই  প্রথম পড়েছিলাম, পরপর পড়েছি ‘আড়কাঠি' যেটা শুনলাম ছায়াছবিতে রূপান্তরিত হচ্ছে, তারপর আমি আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন পড়াতাম ‘জানগুরু' নিয়ে আমি প্রচুর কথাবার্তা শ্রেণিকক্ষে বলেছি, শ্রেণিকক্ষের বাইরে বলেছি এবং এই ‘জানগুরু' বইটি আমার বিশেষ প্রিয়, অন্যগুলো অপ্রিয় সেকথা বলছি না, আমি বলছি এটা একটা বিশেষ প্রিয় পক্ষপাতিত্ব আছে আমার, আর ‘মৃগয়া' যখন পড়লাম এটা নিয়ে পাঁচখন্ডে অখন্ড মৃগয়া যখন হলো সেই মৃগয়া নিয়ে আমি কিছুদিন কিঞ্চিত লিখেওছি এবং আমার কোনো একটি প্রবন্ধের বইতে তা প্রকাশিত হয়েছে। তো এই ‘মৃগয়া' নিয়েও আমার আলাদা কিছু হয়তো জিজ্ঞাসা থাকবে মূলত ভগীরথকে উস্কে দেওয়ার জন্য। তো প্রাথমিকভাবে আমি এইভাবে শুরু করি ভগীরথ যে এই যে যখন ‘জাইগেনসিয়া ও অন্যান্য গল্প’ লেখা হচ্ছে ১৯৮৯ সালে তো বইটি প্রকাশিত হচ্ছে তার আগে থেকেই তো তুমি গল্প লিখতে শুরু করেছো, তোমার গল্পের মধ্যে যে মাটির সুধা-গন্ধ আমরা পেয়েছি এবং যে অত্যন্ত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তুমি যে গ্রামীণ জীবনকে লক্ষ্য করেছো, আমাদের প্রাকৃত জীবনস্রোতকে তুমি লক্ষ্য করেছো তারমধ্যে যে দ্বন্দ্ব এবং সেই দন্দ্ব থেকে যে নিষ্ক্রান্ত হওয়ার চেষ্টা ধরে নাও তোমার ’তস্কর'-এও আছে ‘জাদুকাঠি'-তেও আছে, উপন্যাস দুটোর কথা বললাম এছাড়াও তোমার প্রচুর গল্পসংকলন আছে ‘ঝোরবন্দী'-তেও আছে দারুণ প্রতিবাদ আছে, সবচেয়ে মজার গল্প তো হচ্ছে ‘নকুলবেচের' গল্প কতো আগে লিখেছো, আবার যদি পুর্নপাঠ করি, আমি পুনর্পাঠের তথ্য একটু দিয়ে থাকি এক্ষেত্রে এটা দ্বিতীয়বার এমনি পড়া নয় নতুন করে পড়া নতুন করে পড়তে গিয়েও দেখি, এটা এখনও প্রাসঙ্গিক। এই যে এতোবছর পেরিয়েও তার যে প্রাসঙ্গিকতা থাকা একজন গল্পকার হিসেবে এবং আমাদের গ্রামীণ জীবনের সন্ধানী এক কথাকার হিসেবে তোমার কী মনে হয়? এই যে জাদুটা তুমি এইখানে, কলমের জাদু যেটা ও তোমার যে জাদু দেখাও সে নয়; কলমের জাদু যেটা তুমি প্রকাশ করেছ যে কারণে এটা আজও পাঠকদের টেনে রাখে এবং সবচেয়ে বড় কথা যে অনেককিছু পাল্টে গেছে আমাদের পশ্চিমবঙ্গের জীবনে, আমাদের ভারতীয় জীবনে, বাঙালির জীবনে বিশেষ করে তা সত্ত্বেও এই যে এদের চিরত নবীন হয়ে উঠা এর চাবিকাঠি কোথায়? তোমার যা মনে হয় তোমার সম্পর্কে একটু শুনি, হয়তো তোমার হেঁসেলের দিকেও তাকাতে চাইছি গল্পের হেঁশেল।
ভগীরথ মিশ্র: তপোধীর, আজ সখা সত্যি কথা বলছি একেবারে মনের কথা বলছি, সকাল থেকে খুব ভয়ে ভয়ে আছি। ভয়ে ভয়ে আছি এইকারণে যে আমি আজকে যে মানুষটার মুখোমুখি হচ্ছি সে আমার অভিন্ন হৃদয়ের বন্ধু হতে পারে কিন্তু এই মানুষটির মুখোমুখি হতে আমার তো মনে হয় যে কোনো তাবড় লেখকের বুক ধুরু ধুরু করবে, এটা কিছু বাড়িয়ে বলছি না। আমি তোমার সংস্পর্শে এসে সাহিত্য সম্পর্কে শুধু বাংলা সাহিত্য নয়, বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃত সাহিত্য এবং ইংরেজি সাহিত্য যে একদম হীরক খন্ডগুলিকে তুমি যেভাবে আত্মস্থ করেছ যাকে বলে যেমন একদম সেই হজম করে ফেলেছ তার ফলে তোমার সামনাসামনি হতে যে কোনো তাবড় ঔপন্যাসিক বা গল্পকারের বুক ধুরু ধুরু করার কথা এটা তোমার সামনে বলে আমি বলছি না, তোমার পান্ডিত্য সম্পর্কে আমি আমার বিস্ময়ের শেষ নেই এবং আমার মনে হয়েছে যে, ধারাবাহিক বিশ্লেষণাত্মক যে পর্যবেক্ষণ এবং বিশ্লেষক এই যদি এই প্রক্রিয়াটা যদি কেউ ভিতরে জাগরণ রেখে সাহিত্যের পাঠকক্রিয়াটা চালিয়ে যায় তারপক্ষে মানে তোমার মতো একজন পান্ডিত্যের অধিকারী হওয়া সম্ভব, তুমি অনেকদিন বেঁচে থাকো ভাই। সত্যি খুব ভয় করছে  তোমার প্রশ্নের উত্তর তো দিতেই হবে কিন্তু তুমি একটু আগে যেটা বলে শুরু করেছিলে যে ঐ কবিতাটা দিয়ে শুরু করেছিলে তো তোমার সামনে দাঁড়িয়ে আমি একটা কথা বলি, তোমাকে বলেওছি বোধহয় আগে কখনো যে আমরা হচ্ছি আমরা যেগুলো লিখি, সেগুলো ধরো যে জাতের ফুল আমি ফোটাতে পেরেছি সেই জাতেরই ফুল, তার গন্ধও সেইরকম,তার রংও সেইরকম, তার আকারও সেইরকম, সেইরকমভাবে আমি আমার আপন আনন্দে ফুটিয়ে গেছি; এবার তুমি হচ্ছো বোটানিস্ট, তুমি এটার প্রজাতি নির্দেশ করছো, শ্রেণিবিভাগ করছো, সেই ফুলের জাত, সেই ফুলের রং, সেই ফুলের গন্ধ, সে কোন পরিবারের ফুল তার কী বিশেষত্ব? সেসমস্ত তোমার কাজ, তুমি যে প্রশ্নটা আমায় করলে সেটা হচ্ছে, আমি ১৯৮৯ কিংবা তারও আগে যেসব গল্প লিখেছি সেইসব গল্প আজও কেন প্রাসংঙ্গিক? এ ব্যাপারে আমার নিজস্ব একটা বিশ্বাস আছে এই বিশ্বাস হচ্ছে, এই পাঁচহাজার বছরের ঐতিহ্য সম্পন্ন কৃষিপ্রধান সামন্ততান্ত্রিক ভারতবর্ষ, এই ভারতবর্ষ একটি বিশাল গ্রাম একটি সামন্ততান্ত্রিক কৃষিপ্রধান একটিমাত্র গ্রাম এমনকি তার শহর এবং নগরগুলিও ঐ গ্রামেরই সম্প্রসারিত রূপ, বাইরের চাকচিক্য বেড়েছে, কিছু রাস্তাঘাট হয়েছে, কিছু বৈজ্ঞানিক গেজেট এসেছে, কিছু মানুষের জীবনযাপন পাল্টেছে, কিন্তু তার তলায় সেই শাশ্বত জীবনের  সেই মানুষগুলি তাদের সমস্ত চরিত্র তাদের সমস্ত কিছু নিয়ে তাদের আত্মাটাকে নিয়ে প্রবহমান কাজেই এবং সেই প্রবহমান নদীটি তার বাঁকে বাঁকে এমন কিছু সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করে যাচ্ছে সেই সত্য কিন্তু খুব সহজে খুব অল্পে কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যে বদলে যায় না কিছুতেই কিছু সত্য। তোমার সম্পর্কে বলতে গিয়ে যেটা আমার প্রথমে বলে নেওয়া উচিত, তুমি একটা খুব দামী কথা দিয়ে শুরু করেছ যে, ‘ভগীরথকে যেহেতু আমি এতো ঘনিষ্ঠভাবে তার সঙ্গে মিশেছি, এতো কাছের থেকে দেখেছি তারফলে ভগীরথ সম্পর্কে গড়গড় করে সমস্ত বলে ফেলা যায়', আবার সঙ্গে সঙ্গে সেটা কঠিন কারণ এই সহজভাবে বলে ফেলার মধ্যে কোথাও কিছু দেখার ভুল হয়ে যেতে পারে কারণ এটা অতি সত্যি কথা সাহিত্যের ক্ষেত্রে কারণ তোমাকেই বলি তুমি বুঝবে যে, এই যে আমার হাতের তালুটা আমি দূর থেকে প্রত্যেকটা রেখা দেখতে পাচ্ছি কোনটা দিয়ে কোন রেখা যাচ্ছে কিন্তু এই তালুটাকে যদি আমার নাকের কাছ অবধি নিয়ে গিয়ে দেখি খুব কাছের থেকে কিচ্ছু দেখতে পাচ্ছি না, কাজেই কাছে থেকে দেখার যেমন একটা সুবিধা যেমনি আছে একটা অসুবিধাও তেমনি আছে; তুমি সঠিকভাবে সেটা বলেছ। এখনের এই গ্রামীণ জীবনগুলো এই জীবনগুলোকে আপাতভাবে আমরা সবাই বলি না গ্রামের সহজসরল মানুষ তাদের অনাড়ম্বর জীবনযাপন আমি গ্রামকে আজন্ম দেখেছি, ভারতবর্ষের সামন্ততান্ত্রিক কৃষিপ্রধান গ্রামকে আমি একেবারে কাছের থেকে দেখেছি তারফলে আমি এই সরল জীবনস্রোতের বাঁকে বাঁকে যে কতো চড়া ঘূর্ণিস্রোত তার কোনজায়গায় যে কতোখানি বহিস্রোতের তলায় যে অন্তস্রোতের প্রবাহটিকে আমি চিনেছি এবং সেই অন্তপ্রবাহটি কিন্তু ঘন ঘন বদলে যায় না। নদীর উপরের স্রোত জলের পরিমাণ এবং বাঁকের ধরণে বদলে যেতে পারে কিন্তু অন্তর্লিন যে স্রোতটা অন্তপ্রবাহটা সেটা কিন্তু সহজে বদলে যায় না, তারফলে ১৯৮৮তে বাংলার একটি গ্রামীণ মানুষ বা তার চরিত্র কিংবা তার জীবনযাপন ধরণ, তার বিশ্বাস, তার রীতিনীতিগুলি যেরকম ছিল আজকে ২০২০-তেও তার বড় একটা হেরফের হয়নি। অনেকে বলেন, এটা হয়তো হাল্কাভাবেই বলেন, ভারতবর্ষ অনেকটা পাল্টে গেছে, বিজ্ঞান প্রযুক্তিতে একদম ঘিরে রয়েছে, শহর পিচ রাস্তার মতো সুইমিংপুল, মানুষের জীবনযাপন, মেয়ে শিক্ষা সংস্কৃতি একদম বদলে গেছে, সে আর আগের গ্রাম নেই, সে আগের ভারতবর্ষ আর নেই, আমি এই কথাটার সঙ্গে একমত হতে পারি না। এখনও আমি আমার জন্মভুমির গ্রামে যখন যাই তখন আমি দেখি যে যে কাচা রাস্তাগুলোয় বর্ষাকালে আমরা ব্যালেন্স করে করে হাঁটতাম, আমাদের ঐ এলাকার মাটিকে বলত ‘ভক্তিমাটি' ‘ভক্তিমৃত্তিকা' কারণ তার এতোই ভক্তি সেই মাটি একবার পায়ে যদি ধরে সে আর পা কিছুতেই ছাড়বে না এতো তার ভক্তি সেইজন্যই ঐ এলাকার মাটিকে বলা হতো ভক্তিমৃত্তিকা। ঐ ভক্তিমৃত্তিকার উপর দিয়ে হাঁটলে খালি পায়ে কিছুক্ষণ পরে পায়ে দুটো মাটির জুতো তৈরি হয়ে যেতো, সেইমাটিতে যে ব্যালেন্স করে করে হেঁটেছি সেইসব রাস্তা এখন পিচ হয়ে গেছে, অনেক খড়ের বাড়ি পাকা বাড়ি হয়ে গেছে, প্রত্যেক বাড়িতে বিদ্যুতের আলো জ্বলছে, টি.ভি আছে, ফ্রিজ আছে, প্রায় অধিকাংশ মানুষের ছোট বড়ো মাঝারি মোবাইল আছে, আমার গ্রামে আমি প্রথম হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করা একজন মানুষ ছিলাম, এখন আমাদের গ্রামে প্রায় প্রতিটি পরিবারে একটি গ্র্যাজুয়েট এবং প্রতিটি পাঁচটি পরিবারের একটিতে একটি পোস্ট গ্র্যাজুয়েট এরকম আছে, একদম অশিক্ষিত পড়াশোনো নেই অন্তত এই প্রজন্ম এবং এর আগের প্রজন্মের মানুষ আমার গ্রামে খুঁজে পাওয়া যাবে না। তবুও তবুও এই গ্রামের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিচরণ করেছি বলে এই উপরের এই ধারাটুকু তলায় নামলে দেখি সেই চিরকালীন শাশ্বত ভারতবর্ষ, সেই বিশ্বাস, সেই রীতিনীতির মধ্যে আটকা পড়া সেই কুসংস্কার সেই নানারকমের সেই শাশ্বত সেই আমাদের চিরকালীন ভারতবর্ষটি কিন্তু বইছে। যে মেয়েটি আমায় ছেলেবেলায় ফ্রক কিংবা শাড়ি পরে ঘুরে বেড়াতো, সেই পরিবারের এখন প্রজন্মের মেয়েটি হয়তো ঐ প্যান্ট এবং টপ পরে গ্রামেই ঘুরে বেড়ায় কিন্তু তার হাতে তার বাহুতে কিন্তু গুরুদেবের দেওয়া মাদুলি ঠিক রয়েছে এবং একাদশী করতো তখনকার আমার ছেলেবেলার যে মেয়েরা এখনের তারা আধুনিক তারা ফাস্টিং করে এবং বিশ্বাসে সংস্কারে এবং তলায় যে আত্মা যাকে আমরা বলি সেখানে কিন্তু ঘুমিয়ে রয়েছে সেই শাশ্বত সেই পাঁচহাজার বছরের প্রাচীন ভারতবর্ষ সেটা আমি টের পাই। কাজেই এই আত্মাটি কিন্তু আজকে মরে গেলো, কালকে বেঁচে উঠল, কালকে বদলে গেল ওরকম হয় না। কাজেই তখনকার গল্পে উচ্চারিত যে মর্মকথাগুলো আজ তো পাল্টায়নি আরো বহুবছর হয়তো পাল্টাবে না।
ড.তপোধীর ভট্টাচার্য: সত্যিই! আমার আবার তোমার কথা শুনতে শুনতে জানি না আজকে কবিতায় পেয়েছ কেন একটি কথা বলার...
ভগীরথ মিশ্র: তুমি তো কবি ওরে সাবাস
ড.তপোধীর ভট্টাচার্য: "একটি কথা বলার জন্যে একটি জীবন যায় বাণীর মধ্যে কালির ছোঁয়ায় অনেক কথা লেখা "তোমার বাণীর মধ্যে কালির ছোঁয়ায় অনেক কথা লেখা, যেটা আমাদের চোখে পড়ে সেটাও লেখা, যেটা চোখে পড়ে না সেটাও লেখা, এইজন্যে আমাদের কাজ হচ্ছে একটু অভিযাত্রী হওয়া, আবিষ্কারক হওয়া। আমি আবারও ‘এশিয়া’ গল্পে ফিরে যাই এই যে তুমি নকুলবেচকে এনেছ রূপেশ্বর পালকে এনেছো এরা কতো নাম পাল্টে পাল্টে এসেছে তোমার কাছে, চোরবন্দি গল্পে সেই-ই তো তোমার গগন সাহু। তুমি নামগুলো অত্যন্ত ভেবেচিন্তে নাও ভগীরথ! গগন আকাশ দেখতে চায় কিন্তু মৃত্যুমুহূর্তে যখন সে বাধ্য হয় যে সেই কুয়ো বানাতে গিয়ে মাটির অতলে সেধিয়ে যায়, বুক পর্যন্ত তার চলে আসে কাদাজল এবং তার বৌ এসে তার বাচ্চাকে নিয়ে উপরে কান্নাকাটি করে এটার মধ্যে যে তীব্র ট্র্যাজেডি আছে এবং এরসঙ্গে যে নির্মম যে শোষণের শাসনের যে যন্ত্রণা এইসমস্ত কিছু আছে, এই কথাগুলি তুমি কতো সাবলীলভাবে লিখতে থাকো এবং এখনও লিখছো। তোমার ‘তস্কর' উপন্যাসেও তা পাই। আমি তোমার উপন্যাসের মধ্যেও তাই পাই কিন্তু তাই বলে কী এটা বলব যে ছোটগল্প নামক শিল্পমাধ্যমকে তুমি এতো চমৎকারভাবে ব্যবহার করেছো, করে গেছো আগাগোঁড়া  যে এগুলোর সম্প্রসারণ তো নয়, তোমার আখ্যান বা উপন্যাস। উপন্যাসের মধ্যে তোমার কলমের একটা কিছু অতিরিক্ত কিছু একটা এসে জুড়ে বসেছে, উপন্যাসে আমি একটু পরে আসছি।
তোমার ‘রাবণ' গল্প আমার অত্যন্ত প্রিয় জানো। এই ‘রাবণ' গল্পই বলো কিংবা সুবচনী-ই বলো এই যে গল্পগুলো বারবার আমাদের পড়েও আমাদের তৃপ্তি হয় না এর কারণ হচ্ছে মনে হয়, এই যে লেখক অর্থাৎ এইক্ষেত্রে ভগীরথ মিশ্র উনি একটি কথা বলার জন্যে একটি জীবন যায় এই মূল যে বাণী সেটাই আমাদের কাছে পৌঁছে দিতে চাইছেন, বলতে চাইছেন, ‘আমি যা বললাম শুধু সেটা পড়ো না তোমরা এটার পেছনে যে বাণীটুকু আছে আমার যা আসলে তোমাদের কাছে আমি সংযোগ ঘটাতে চাইছি আমার ঐ সংযোগের যে মূল কারণটা এটা বুঝো'। এটা কী আমি ঠিক বলছি ভগীরথ?
ভগীরথ মিশ্র: তোমার সম্পর্কে তোমার পাণ্ডিত্য সম্পর্কে আমার শ্রদ্ধাটা exactly কোথায় জানো, তুমি একটু আগে যে কথাটা বললে ইংরেজি ভাষায় খুব সুন্দর করে একটা কথা তিনটি শব্দে সেটাকে বলা আছে 'Between the lines' দুটো লাইনে কালি দিয়ে লেখা কিছু শব্দ এবং এই দুটো লাইনের মাঝখানে একটা সাদা জায়গা, ঐ সাদা জায়গাটা ছাপার ক্ষেত্রে একটা প্রয়োজন মেটায় বটে কিন্তু একজন স্রষ্টার ক্ষেত্রে ঐ সাদা জায়গাটাতে কী লিখা আছে সেইটা খুঁজে বের করাটাই কিন্তু তোমাদের মতো সাহিত্যের যারা ময়নাতদন্ত করায় উস্তাদ তারা ঐ সাদা জায়গাটায়  কী লিখা আছে, আমরা তো প্রতিটা গল্পে এই বার্তাটিই দিই যে, ছাপার অক্ষরে যে কালো কালো পোকা পোকা পোকা যে শব্দগুলো আছে তার দ্বারা আমি কী লিখেছি সেগুলো সব পেয়ে যাচ্ছ তাহলে আমি কী বলতে চাইছি যেটা লিখলাম না সেটা কোথায় লেখা রইল ঐ দুটো লাইনের মাঝখানের সাদা জায়গাটা ওটাকে খুঁজে বের করার জন্য সহৃদয় পাঠক আছেন, সহৃদয় সামাজিক পাঠক আছেন আর তপোধীরদের মতো বোটানিস্টরা রয়েছে, বিশ্লেষকরা রয়েছে, পণ্ডিতরা রয়েছেন। কিন্তু তুমি ঐ কথাটা ঠিকই বলেছ যে আমরা প্রতিটা গল্পে কিংবা উপন্যাসে কিছু বলতে যা বলি তার থেকেও অতিরিক্ত অনেককিছু বলতে চাই যে, ঐ অতিরিক্ত যা বলতে চাই তাই বদলায় না কিছুতেই; যারজন্য ১৯৮০তে ঐ যে কথাগুলো বলতে চাইছিলাম ঐ নকুলবেজের গলায় কিংবা ঐ গগন সাহু-এর গলায়, সেই কথাগুলো আজও তুমি নিজেই স্বীকার করছো যে আজও প্রাসঙ্গিক।
ড. তপোধীর ভট্টাচার্য: অবশ্যই প্রাসঙ্গিক। আমি আরেকটা কথা বলছি যেটা আমি আগে ভাবিনি জানো এটা আমার বলতে পারো গত কয়েকমাস আমার মধ্যে একটা revelation হয়েছে, আমার যখন ঐ কিছুদিন আগে আবার নতুন করে তোমার একান্নটি গল্পসংকলন সেটা পড়লাম, আমি দেখলাম যে না সব গল্প পাচ্ছি, আমি তোমার আরো সবগুলো গল্পসংকলনই তো আছে আমার কাছে; আমার নিজের সঙ্গে নিজের একটা দ্বিরালাপ হলো ভিতরে ভিতরে। আচ্ছা আমি একটু সামলেসুমলে কথা বলব তুমি বুঝে নিও যে এখনকার যে পশ্চিমবঙ্গ কিংবা পশ্চিমবঙ্গের বাইরেও যে বাঙালির জীবন আমরা কিন্তু অনেকখানি ভ্রষ্ট হয়ে গেছি আমাদের বাঙালিত্ব থেকে আমি আবারও বলছি আমি এটাকে ব্যাখ্যা করব না আমার মতো করে এবং এক হিসেবে দেখতে গেলে ২০১১ সালের পরে তো পশ্চিমবঙ্গের পট পরিবর্তন হয়ে গেছে  রাজনৈতিক পট পরিবর্তন, তার ভালো হয়েছে কি মন্দ হয়েছে তার মধ্যেও আমি যাব না, তারপরে আট নবছর হতে চলল এই ন’বছরে অনেককিছু আমাদের চোখের সামনে পাল্টে যেতে দেখলাম তারমানে একটা পরিবর্তিত সমাজ অথচ এবার হচ্ছে আমার কথাটা যেটা বলতে চাইছি আমার মনে হচ্ছিল যদি আমরা একটু অন্যভাবে interpret করি, interpret- এ তো আসল আমি যদি অন্যভাবে ভাষ্য করি আর যেহেতু তুমি সময়ের বুক থেকে ধাক্কামোচন করা এক তীর্থঙ্কর চিরকালের এক তীর্থঙ্কর। সেইজন্য আমার মনে হলো, ঠিক বলছি কিনা তুমি বলবে যে আমি এক পরিবর্তিত বাস্তবে বসে অনেককাল আগের ধরে নাও ত্রিশ বছর আগের, পঁচিশ বছর আগের তোমার যে লেখা সেই লেখার মধ্যে মনে হচ্ছে তুমি যেন একটা সবার অজান্তে কিংবা হয়তো নিজেরও অজান্তে অনেকটা আগাম সংকেত আমাদের দিয়ে যাচ্ছ যে পচনক্রিয়াটা যখন শুরু হয়েছে তখন তুমি দেখিয়ে দিচ্ছ যে, এই দেখ পচনক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে কিন্তু পচনক্রিয়া গিয়ে কোথায় থামবে এটা বলা তো লেখকের কাজ না কিন্তু আমাদের তুমি সতর্ক করে দিয়েছো ভিতরে ভিতরে। আমার মনে হচ্ছে যে আমি একটা উত্তরপাঠ একটা পোস্ট হাইফেন একটা রিডিং আমি এখন এটা পেয়ে যাচ্ছি আমার আজকের সময়ে বসে অনেককিছু পাল্টে গেছে, অনেককিছু অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে কিন্তু তোমার ঐ বিশেষকিছু গল্প আজও আমার কাছে মনে হচ্ছে যে সে নতুন তাৎপর্য নিয়ে আসছে আর যা তাৎপর্য বয়ে আনে তাই সত্য। তাই সাহিত্যের সত্যকে ধারণ করে বলে আমার বিশ্বাস এবং সেইজন্যে ঐ সাহিত্যের সত্য ধারণ করার ক্ষমতার দিক দিয়ে আজও তোমার গল্পগুলি অদ্বিতীয়। এই অর্থেই আমি বলছিলাম যে আমার কাছে এদের সামাজিক এবং নান্দনিক প্রাসঙ্গিকতা দুটোই কিন্তু এবং ঐতিহাসিকও বটে আমার কাছে রয়ে গেছে। আমি কি ঠিক ভাবছি?
ভগীরথ মিশ্র: তুমি তো একেবারে ঠিক ভাবছো, আমি আরেকটু সংযোজন করি এই যে তুমি ১৯৮০ এর গল্পের সঙ্গে ২০২০তে নতুনভাবে তার প্রাসঙ্গিকতা খুঁজে পাও যে তুমি এই দুটো সময়ের মধ্যে যে সূক্ষ সুতোটি একদম অবিচ্ছেদ্যভাবে রয়েছে সেটাকে তুমি খুঁজে পাও, আমরা যারা গ্রাম ভারতবর্ষ নিয়ে গল্প লিখি তারা অধিকাংশই আমরাই গ্রামজীবনটাকে কতোটা ফুটিয়েছি সেটারই প্রস্তুতি গাইতে গাইতে কলমের সব কালি শেষ করে দেই সেই কারণে এবং মোটামুটি গ্রামজীবন কতো নিপুণভাবে ধরা হয়েছে। মফস্বল জীবন এটা তো হচ্ছে পটভূমিকা অর্থাৎ তুমি গাছটা কোথায় পুঁতবে? গাছটা শিলচরে তপোধীরের বাড়ির বাগানে পোঁতা হতে পারে কিংবা আমার ব্যারাকপুরের বাড়িতে পোঁতা হতে পারে। ওটার জন্য একফুট বাই এক ফুট জায়গা হলেই যথেষ্ট। তারপর যে গাছটা উঠলো খানিকটা উঠার পর সে চার ফুট বাই চার ফুট জায়গা দখল করছে, তারপর যখন উঠলো তখন সে বিশ ফুট বাই বিশ ফুট একটা জায়গা দখল করলো, তারপর পুরো আকাশ ছড়িয়ে দিচ্ছে নিজেকে আর তারপর সেইগাছে যখন ফুল ফুটল সেই ফুলের গন্ধের তো কোনো সীমানা বেঁধে দেওয়ার উপায় নেই; কাজেই গ্রামজীবন একটা পটভূমি, সেইকারণে কোনো নাগরিক বন্ধুকে কিংবা সহজ সরল পাঠককে আমার কোনো বই দেওয়ার সময় আমি সবসময় বলে দিই একটু দেখে শুনে পড়বেন ভাই। গ্রামের মানুষ গ্রামের মানুষ যখন হাইবাপ বলে তখন তার ছটা মানে হয়, গ্রামের মানুষ যখন চিড়িক করে থুতু ফেলে তখন থুতুর সঙ্গে আরো বহুকিছু ফেলে দেয়, একটু দেখে শুনে পড়বেন ভাই এই দেখেশুনে পড়তে বলার অনুরোধটা এই কারণে, যে তুমি একটু আগে যেটা উচ্চারণ করলে যে এই গ্রামজীবনের পটভূমির উপর দাঁড়িয়ে আমি কোনো গ্রামজীবনের কথা গ্রামের কথা বলি না। আমি বলি মানুষের কথা, জীবনের কথা, তাদের সমগ্র আত্মার কথাটা বলি, সে গ্রামেও বলছি আমি যদি শহরে জন্মাতাম, বড়ো হতাম, শহরেরই কোনো পটভূমিতে লিখতে পারতাম কিন্তু গ্রাম বা শহর নিয়ে এখানে গল্পটা আটকে থাকে না। গল্পটা আছে যেখানে সেটা তুমি একটু আগে বললে।
ড.তপোধীর ভট্টাচার্য: আমি তোমাকে মনে করিয়ে দিচ্ছি ভাই, তোমারই একটি গল্প ‘পথ' আমার কী মনে হয় জানো এই গল্পটা তখন মনে হয়নি কিন্তু যেটা নিয়ে যখন আমি লিখেছিলাম বেশ কিছুবছর আগে তখনও মনে হয়নি, কিন্তু আজকে আমি যখন পেছন ফিরে তাকাচ্ছি আর নতুন করে তোমার ‘পথ' গল্পটা  পড়ছি, সেই যে মল্লাগয়া আর মথুরাবিহারী এদের মধ্যে পথ নিয়ে সমস্যাটা, তো সেখানে আমার মনে হচ্ছে যেন সেটা একটা সংকেতগর্ভ গল্প কেউ হয়তো আপত্তি করতে পারে কিন্তু ঐ যে এখানে অনেকটা কথকস্বরে তুমি আমাদের একটা দারুণ কথা বলে দিয়েছিলে। এটা কী আজ মর্মান্তিক সত্য নয় আমাদের জীবনে এবং এখানেই সেই পুরনো কথাটা ফিরিয়ে আনতে ইচ্ছে করে, যে লেখক ত্রিকালদর্শী এবং তার ঐ ত্রিকালদর্শীতার সংকেত কিন্তু এইখানে, এই ‘পথ' গল্পটা সত্যি বিপুল তাৎপর্য সম্পন্ন একটি গল্প। সেখানে যুধিষ্ঠির মন্ডল আছে, ত্রৈলোক্য মন্ডল আছে আরো অনেকে আছে। হঠাৎ করে যখন হার্ট অ্যাটাক হয়ে পড়ে যায় একটা লোক এবং তাদের মধ্যে ঝগড়া বিবাদটা তাদের মধ্যে বন্ধ হয়ে যায় এবং তারপরেও কিন্তু তারা অন্ধকারের মধ্যে একমাত্র জেগে থাকে যে ড্রাইভার, বাকীরা সব ঝুলছে এটাই কিন্তু দারুণ সত্য, সবাই ঝুলতে থাকে তন্দ্রায় থাকে একজন শুধু জেগে থাকে যে সঠিক পথে আমাদের নিয়ে যাওয়ার জন্য দায়িত্বটা যার এবং তারপরেও হঠাৎ মনে হয় চারদিকে অন্ধকারের প্রাচীর, পথ কোথাও নেই কিন্তু পথ থাকে, পথ শুধু খুঁজে নিতে হয় যেন এই বার্তাটাই তুমি দিয়েছো। কতো আগে লিখেছ বলো দেখি ভগীরথ এবং গল্পটা আমার কাছে কী মানে নিয়ে আসছে?
ভগীরথ মিশ্র: পাশাপাশি আরকটি কথাও বলতে চেয়েছি সেটা হচ্ছে এই যে পথ খুঁজে খুঁজে এগোতে গিয়ে গল্পটা শেষে গল্পটা একটা অসমাপ্ত পথের একদম মুখে গিয়ে দাঁড়িয়ে গেলো এইটাই সত্য এবং এই পথ চির অসমাপ্ত never ending একটা journey.
ড.তপোধীর ভট্টাচার্য: এজন্য কি বলব জানো তো তুমি আসলে বর্নচোরা কবি, কবিরাই কিন্তু সংকেতের ভাষায় কথা বলে। তুমি কখনো ধরা দাওনি কিন্তু তোমার ছোটগল্পের মধ্যে এরকম অনেক সংকেতগর্ভ যা কবিতার ভাষা, মূলত পড়া ভাষা বলি আমি এটাকে। ‘চিকনবাবু'-তে এই যে এসে আপাতদৃষ্টিতে তোমার আগের থেকে একটা অন্য বাকে ফিরলে, ফিরবেই তো একজন সৃষ্টিশীল লেখক তো বাক ফিরবেই, এরপরে তুমি ‘অ্যাকুরিয়াম'-এর পর্বে চলে এলে ‘জংশন'-এর পর্বে চলে এলে সেরা ৫০ টি গল্পই বলো আর  আমার একান্নটি গল্পই বলো, এগুলো আমাদের সুবিধে করে দিয়েছে। এইবার এখানে দাঁড়িয়ে  আমার মনে হয়, ছোটগল্প লেখে তুমি মোটামুটি চিরস্থায়ী একটা আসন গড়ে নিয়েছ, তাহলে তুমি উপন্যাস কেন লিখলে? না, আমি তোমায় চার্জ করছি না, বেশ করেছ উপন্যাস লিখেছ। আমি তোমার শিল্পীত একটা উত্তর চাইছি আর কী? ধরো আমি পূর্বপক্ষ, তুমি উত্তরপক্ষ। পূর্বপক্ষের কায়দায় আমি বলি, তালে কী ছোটগল্পে অনেক সংকেত দিলেও সব কথা বলা যায় না কিংবা মনে করা যায় যে আমি জীবন এবং জগতের যে দিগন্তগুলো আমি ছুঁতে চাই, মানে আমি বলতে লেখক সবগুলো ছোঁয়া যায় না তাই অনবরত সন্ধানে বেরিয়ে পড়তে হয়? সন্ধান তো বটেই! না হলে ‘অন্তর্গত নীলস্রোত' থেকে তুমি কোনোদিনই পৌছাতে না ‘মৃগয়া'-য় বা মৃগয়ার আগে যেটা আমার খুব প্রিয় উপন্যাস ‘জানগুরু'-তে আসতে না। আমি যে কথাটা বললাম এর শিল্পজিজ্ঞাসার প্রান্ত থেকে তোমাকে একটা তোমার কাছে এই এক জিজ্ঞাসা হাজির করলাম,যে ভগীরথ মিশ্র যিনি সত্যিকারের সব্যসাচী যার  দুটো হাত-ই সমান চলে অর্থাৎ ছোটগল্পেও তিনি উপন্যাসেও তিনি, তো সেই মানুষটি তার শিল্পীত তৃপ্তি কি বেশি হল উপন্যাসে? নাকি তার সন্ধান তো শেষ হয়নি যদি হতো তাহলে মৃগয়ার পরে তুমি ঐন্দ্রজালিক এর মতো এতো ইতিহাস গবেষণা অধ্যবসায় নির্ভর উপন্যাস লিখতে না বা জাদুগরও লিখতে না। আমার জিজ্ঞাসাটা কি খুব ভুল?
ভগীরথ মিশ্র: না ঠিকই। একশোটা মতো গল্প লেখার পর আসলে আমার ছেলেবেলা থেকে আমার যে গ্রামীণ পরিবেশে আমার যে কৈশোরটা কেটে গেছে, যারা কাছের থেকে দেখেছে খানিকটা বা শুনেছে তারা জানে যে আমি ক্লাস টু-তে যখন পড়ি তখন গ্রামীণ জাদুকরের সঙ্গে কাউকে কিছু না বলে পালিয়ে গিয়েছিলাম এবং একমাস আমি বাড়ির বাইরে ছিলাম। আমি আমার বাবা মায়ের ছটি বোনের পরে একমাত্র পুত্রসন্তান। জাদুকরের সঙ্গে একমাস বসতি করা সে এক গল্প, ফিরে আসা আরো নাটকীয়। আমি আমার যৌবনে দীর্ঘকাল পেশাদার দলে যাত্রা পেশাদার দলে মাইনে নিয়ে অভিনয় করেছি। ষাটের দশকে বা সত্তরের দশকের প্রথম পর্যন্ত আমার মাইনে ছিল নাইট পিছু আট টাকা, তখনকার দিনে আট টাকা অনেক টাকা। ওঝা গুণীনের সাগরেদি করেছি, সাপুড়ের সাগরেদি করেছি, আমি ইলিশ মাছের ব্যবসা করেছি। তেরো বছর তো জাদু শিখেছি, হ্যাঁ, একজন জাদুকরের ওস্তাদের শিষ্য হয়ে তেরো বছর জাদু শিখেছি। আমার এই জার্নিটা আমি যখন একশোটা গল্প লেখা শেষ হয়ে গেলো তখন আমার মনে হল, আমার কলম নিসফিস করছে, এই পুরো একটা বড়ো একটা ক্যানভাস সে বড়ো বড়ো ছবি আঁকতে এবং ছোটগল্পে আমার এই যে ভিতরের যতো বমনপর্ব শুরু হয়েছে তখন সে আর ছোট্ট একটা কাপে ধারণ করতে গিয়ে উপচে যাচ্ছে তার ফলে তুমি বললে না আমার গল্পগুলোতে এখন পড়লে বুঝি কোনো কোনো গল্পে একটু অধিক কথন রয়েছে যেটা আরো একটু precise হবার দাবী রাখে, কারণ আর কিছু নয় তখন আমার মধ্যে সেই আজন্ম আকৈশোর আশৈশব যেসমস্ত আমার মধ্যে ঢুকেছে সেগুলোর যে বমনপর্ব উদ্গীরণ পর্ব শুরু হয়েছে সে আর একেকটা ছোট ছোট কাপে ধারণ করতে পারছে না, উপচে যাচ্ছে। আমার তখন কলম নিসফিস করতে লাগলো বড় জায়গায়, আমি তোমাকে আমার দুটো উপন্যাসের কথা স্মরণ করিয়ে দিই, উপন্যাসের কথায় এলে হয়তো তুমি বলবে; আমি আমার উপন্যাসগুলিতে যে জীবন নিয়ে একটা উপন্যাস লিখেছি তারপরের উপন্যাসটি একেবারে অন্যজগতের আরেকটা উপন্যাস আমি ‘অমানুষনামা' বলে একটি উপন্যাস লিখেছি যে উপন্যাসটি রয়েল সাইজে ৫০০পৃষ্টার এবং এই ৫০০পৃষ্টার উপন্যাসে কোনো মনুষ্য চরিত্র নেই, সমস্ত চরিত্রই হচ্ছে street dogs পথের কুকুর হচ্ছে আমার ৫০০ পৃষ্টা উপন্যাসের একটি চরিত্র এবং তাদের দৃষ্টিতে এই মানবসভ্যতা এই মানব প্রজাতিকে দেখা হয়েছে।  
(সাক্ষাৎকারের শেষ অংশ পরবর্তী সংখ্যায় প্রকাশিত হবে)


Created with WebSite X5
LOREM IPSUM
Lorem Ipsum
Dolor sit amet, 12
12345 Consectetur (Adipiscing)
+00 012 345 678  | +00 012 345 678 (fax)
info@example.com
BLOG
DESIGN
Back to content