গিরিশচন্দ্র ঘোষ ও মাইকেল মধুসূদন দত্তের দৃষ্টিতে ‘জনা'
Published by রঞ্জন কুমার ভট্টাচার্য in প্রথম পর্ব, দ্বিতীয় সংখ্যা, অক্টোবর ২০২৫ · Friday 31 Oct 2025 · 6:30
Tags: প্রবন্ধ
Tags: প্রবন্ধ
গিরিশচন্দ্র ঘোষ ও মাইকেল মধুসূদন দত্তের দৃষ্টিতে ‘জনা'
রঞ্জন কুমার ভট্টাচার্য
সুদীর্ঘকালের মধ্যযুগীয় জড়তা কাটিয়ে উনিশ শতকে ভারতীয় জীবনে পাশ্চাত্য
জাদুকাঠির সংস্পর্শে যে নবজাগরণের সূচনা হয়েছিল তার প্রথম স্ফূরণ ঘটেছিল
কলকাতাকেন্দ্রিক বাংলার জনজীবনে। স্বভাবতই তৎকালীন বাংলা সাহিত্যেও এর প্রভাব
দৃষ্টিগোচর হয়েছিল। আমরা সেখানে তিনটি
ধারা দেখতে পাই- প্রথম ধারাতে দেখা যায় পাশ্চাত্য ভাবধারাকে অনুকরণ
করে জীবনকে নতুন করে দেখার প্রচেষ্টা। প্রাচীন ঐতিহ্য এখানে ব্রাত্য। দ্বিতীয় ধারায়
দেখতে পাই সেই গোষ্ঠীকে, যারা শুধুমাত্র ভারতের প্রাচীন ঐতিহ্যের মধ্যে
অনুসন্ধান করেছিলেন ভারতীয় জ্ঞান বিজ্ঞানের যাবতীয় উৎসকে, যা প্রথম ধারার
বিপরীত মেরুর প্রতি অন্ধ অনুবর্তন। প্রথম ধারায় যেভাবে অন্ধের মতো পাশ্চাত্য ধারার
দিকে ঝুঁকেছিলেন, দ্বিতীয় ধারায় ঠিক সেভাবে প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতার মধ্যে
আবিষ্কার করেছিলেন আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের জগৎকে। দুই দলই ছিলেন ভ্রান্ত এবং
আংশিকতা দোষে দুষ্ট। এই প্রথার বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথ খেদ প্রকাশ করে বলেছিলেন- "আধুনিক
বিজ্ঞানের সমুদয় সিদ্ধান্তই শান্ডিল্য, ভৃগু ,গৌতমের জানা
ছিল…আমাদের বৈদিক পৌরাণিক যুগ যে চলিয়া গিয়াছে এ বড়ো
দুঃখের বিষয়।’ আবার তৃতীয় গোষ্ঠী শুধু প্রাচ্য কিংবা পাশ্চাত্য নয়, ভারতীয় প্রাচীন
ঐতিহ্য এবং পাশ্চাত্য জ্ঞানের আলো এই দুয়ের সমন্বয়কে কেন্দ্র করে ভারতীয়
দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে নতুনত্বের সূচনা করলেন। আর রাজা রামমোহন রায় ছিলেন এই ধারার
পথিকৃৎ। পরবর্তীকালে এই ধারাকে সমৃদ্ধ করলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ
প্রমুখ।
আমরা এবার
প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সমন্বয়ের ধারার আলোকে গিরিশ ঘোষ ও মধুসূদনের দৃষ্টিতে ‘জনাকে' দেখার চেষ্টা
করব।
গিরিশ ঘোষ তাঁর জনা নাটকটিকে পাশ্চাত্য আঙ্গিকে রূপ দিলেও আঙ্গিককৃত বিষয়বস্তুর
যেমন নবরূপায়ণ ঘটাতে পারেননি, অন্যদিকে তেমনি অতীতের গর্ভ থেকে জনা চরিত্রকে গ্রহণ
করলেও প্রাণ সঞ্চার করতে পারেননি। তাই তাঁর জনা চরিত্র মূলত মৃত অতীত হয়েই রয়ে
গেল। তাইতো এই নাটকে জনা যেমন যথার্থ মা হতে পারেননি ঠিক তেমনি নিজের একমাত্র
সন্তান হারানোর পরও সত্যিকারের প্রতিহিংসা পরায়ণা এক রমণীও হতে পারেননি। যতটুকু
দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে তা যান্ত্রিকতা উর্ধ্বে
নয়।
আমরা নাটকের
প্রথম অঙ্কের প্রথম গর্ভাঙ্কের শুরুতে দেখতে পাই কল্পতরু হয়ে অগ্নিদেব তিনজনকে তিন
প্রার্থিত বর প্রদান করেছেন। যেখানে জনার আকাঙ্ক্ষা ছিল- "নাহি অন্য
বাসনা আমার/ যেন অন্তকালে গঙ্গাজলে/ ত্যজি
প্রাণ বায়ু।’
জনার এই উক্তি
থেকে আমরা জানলাম তার জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য জাহ্নবীর কোলে আশ্রয় নেওয়া, যা একজন মায়ের
জীবনের একমাত্র কাম্য হতে পারে না। সন্তান বৎসল মা চিরদিনই ঈশ্বরের কাছে প্রথমেই
তাঁর সন্তানের মঙ্গল কামনা করেন। ভারতচন্দ্র তাঁর অন্নদামঙ্গল কাব্যে এক নিরক্ষর
রমণীর উক্তিতে যথার্থ মাতৃত্বের স্বরূপ ফুটিয়ে তুলেছেন। দেবী অন্নপূর্ণা যখন
ঈশ্বরী পাটনীকে বর চাইতে বলেন তখন এই দরিদ্র রমণী স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলে- "আমার সন্তান
যেন থাকে দুধে ভাতে।’ -যার মধ্য দিয়ে একজন মায়ের কাছে তার
সন্তানের মঙ্গল কামনাই যে জীবনের প্রধান উদ্দিষ্ট তা-ই মূর্ত হয়ে উঠেছে। কিন্তু ‘জনা' নাটকের শুরুতেই
জনার এক ব্যতিক্রমধর্মী চরিত্র ফুটে উঠল যা নারীদের সহজাত মাতৃসত্তাকে অনেকটাই
ক্ষুণ্ণ করেছে। আবার প্রথম
অঙ্কের চতুর্থ গর্ভাঙ্কে জনা প্রবীরের উক্তির পরিপ্রেক্ষিতে বলেন-
"হয় হোক
যা আছে মা জাহ্নবীর মনে,
রণ-সাধ যদি তোর
রণ পণ মম।’
একজন মা তার একমাত্র পুত্রের
উদ্দেশ্যে এরূপ উত্তেজনাব্যঞ্জক উক্তি করতে পারেন না। এখানেও আমরা দেখি গিরিশ ঘোষ
জনাকে যথার্থ মাতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত করতে পারেননি। যখন ‘কর্ণকুন্তী
সংবাদ'- এ
কুন্তীকে বলতে শুনি-
"ত্যাগ
করেছিনু তোরে,
সেই অভিশাপে পঞ্চপুত্র বক্ষে করে
তবু মোর চিত্ত পুত্রহীন;’
-যার
মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ মাতৃত্বের নিভৃত অনুভূতির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
আমরা দ্বিতীয় অঙ্কের প্রথম গর্ভাঙ্কে জনার কন্ঠে পতিপ্রাণা পুত্রবধু
মদনমঞ্জরীকে বলতে শুনি-
"কুলবালা, কুলব্রত কর
আচরণ
যুদ্ধপণ কভু মম হবে না লঙ্ঘন।’
এখানে তিনি ক্ষত্রকূল ধর্মের
দোহাই দিয়ে মদনমঞ্জরী কে ভর্ৎসনা করেছেন, এই যুদ্ধে তিনি যে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ এটুকু
ঘোষণা করেছেন। একজন ক্ষত্রিয় রমণীর আচরণে ক্ষত্রকূলধর্মের বহিঃপ্রকাশ ঘটবে এটা
স্বাভাবিক, কিন্তু
একজন রমণীর মাতৃসত্তার চাইতে কখনও কোনো
ধর্ম শ্রেষ্ঠ হতে পারে না। মায়ের কাছে তার সন্তানই প্রথম এবং পরম সম্পদ। এখানে
তিনি ক্ষত্রিয় রমণী হিসেবে যতটা প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন, মাতৃত্বের
মর্যাদা ততটাই ক্ষুণ্ণ হয়েছে। তাই তো একমাত্র পুত্র হারানোর
পর একজন মা যতটা প্রতিহিংসা পরায়ণা হয়ে ওঠেন তিনি ততটা হতে পারেননি।
মাঝে মধ্যে জনার জবানিতে প্রতিহিংসাব্যঞ্জক
উক্তি ধ্বনিত হলেও পঞ্চম অঙ্কের তৃতীয় গর্ভাঙ্কের শেষে তার নিজের একমাত্র
আশ্রয় মা জাহ্নবীর জলে ঝাঁপ দেওয়ার আগের উক্তিগুলো মাতৃসত্তার উপর কশাঘাত করেছে-
"তাই রণস্থলে পুত্রে ফেলে
তোর কোলে জুড়াতে এসেছি।
শুয়ে তোর কোলে------
শীতল সলিলে নিশ্চিন্তে ঘুমাব, মা গো,’
এখানে যদিও
দেখানো হয়েছে একমাত্র পুত্র নিহত হওয়ার পর প্রতিহিংসা পরায়ণতায় ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন
এবং অক্ষমতার কারণে গঙ্গার জলে ঝাঁপ দিয়ে নিজেকে জুড়িয়েছেন। কিন্তু নাটকের শুরুতে
জনার একমাত্র আকাঙ্ক্ষার কথা আমরা ভুলিনি। তাই গঙ্গার জলে জনার ঝাঁপ দেওয়া
পুত্রশোকের কারণে আত্মহত্যা নয়, এটা তার একমাত্র বাসনার পরিতৃপ্তি। এভাবে একমাত্র
পুত্রকে যুদ্ধে যাবার জন্য প্ররোচিত করে ওই সন্তানের মৃতদেহ রণভূমে ফেলে রেখে আসলে
নিজের একান্ত আকাঙ্ক্ষা পরিতৃপ্ত করার জন্য আত্মসমর্পণ কোনো মায়ের কাছ থেকে আমরা
আশা করতে পারি না এবং ক্রোড় অঙ্কে দেখি জনা প্রসন্ন মনে হর-পার্বতীকে চামর
দুলাচ্ছেন-
"জনা
প্রসন্ন বদনা
চামর ঢুলায় পাশে,
নহে আর পুত্রশোকে উন্মাদিনী।’
জনার এই প্রতিচ্ছবি বিশ্বের সমস্ত মাতৃসত্তাকে আহত করেছে।
এখানে একটা কথা
বলতে হয় গিরিশ ঘোষ যদি এই নাটকের শেষে ক্রোড় অঙ্ক না দেখিয়ে যবনিকা টানতেন তবুও
জনা চরিত্রে কিছুটা মানবিক দিক ফুটে উঠত। কিন্তু তা না করে তিনি মূলত প্রাচীন
ঐতিহ্য ও জন্মান্তরবাদের অন্ধ অনুকরণ করে জনার মানবিক দিককে খর্ব করেছেন। উল্লেখ্য
বিদ্যাসাগর কিন্তু ‘সীতার বনবাস' গ্রন্থে সীতার পাতাল প্রবেশ ঘটাননি। তিনি
যেভাবে তার জীবনের পরিসমাপ্তি দেখিয়েছেন তা হয়েছে বাস্তবানুগত। গিরিশ
ঘোষ কিন্তু তা দেখাতে পারেননি। তিনি অতীতকে অন্ধ অনুকরণ করেছেন, অনুসৃষ্টি হয়নি।
অতীত এখানে মৃত অতীত হয়েই থেকে গেল।
অপরদিকে মধুসূদন পাশ্চাত্য
শিল্পনীতি অনুসরণে তাঁর নাট্যকাব্য ' নীলধ্বজের প্রতি জনা'তে জনা
চরিত্রকে উপস্থাপন করলেন এক মানবীয় রমনী হিসেবে। মধুসূদন এই কাহিনিটি মহাভারতীয়
অশ্বমেধ পর্ব থেকে গ্রহণ করেছেন। মাহেশ্বতীপুরীর জনা এবং নীলধ্বজের একমাত্র পুত্র
যুবরাজ প্রবীরের মৃত্যুতে শোকাতুরা জননী যখন দেখলেন তার স্বামী নিলধ্বজ পুত্রহন্তা
অর্জুনের সঙ্গে বিবাদ পরাঙ্মুখ হয়ে সন্ধি স্থাপনে রত হয়েছেন তখনই জনা তাকে ব্যঙ্গ
করে এই পত্রের অবতারণা করেছেন। সমস্ত পত্র জুড়েই রয়েছে স্বামীর প্রতি ব্যঙ্গ ও
অভিমানের সু। নানা বাক্যবাণে স্বামীকে করেছেন জর্জরিত। কিন্তু সেই সঙ্গে স্বামীর
প্রতি যাতে অমর্যাদা প্রদর্শন না হয়, প্রাচীন এই রীতির প্রতিও জনা ছিলেন
সচেতন। তাইতো জনা বলেছেন- "কি না তুমি
জানো রাজা? কি কব
তোমারে?’
এই নাটকের
শেষের দিকে আমরা দেখি পুত্র শোকাতুরা জনা সব অপমান থেকে মুক্তি পেতে গঙ্গা বক্ষে
ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করতে চেয়েছেন-
"কেমনে
এ অপমান সব ধৈর্য ধরি।
ছাড়িব এ পোড়া প্রাণ জাহ্নবীর জলে।’
গিরিশ ঘোষের জনাকেও আমরা দেখেছি
গঙ্গায় ঝাঁপ দিয়েছেন, কিন্তু তা আত্মহত্যা ছিল না। সেখানে ছিল এক রমণীর জীবনের
একমাত্র বাসনার পরিতৃপ্তি, কেন না, আমরা নাটকের শুরুতেই অগ্নিদেবের কাছ
থেকে বর চাওয়ার সময় জানতে পেরেছি জনার জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্যের কথা। কিন্তু
মাইকেলের জনার আত্মত্যাগ কোন বাসনার পরিতৃপ্তি নয়, এ হচ্ছে পুত্র
শোকাতুরা এক জননীর পুত্রশোক ও অন্যান্য অপমান থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার এক উপায় মাত্র।
জনার
লেখনিমুখে পরিবেশিত এই পত্রের শেষাংশে চকিত উদ্ভাসে মধুসূদন তাদের বিগত দাম্পত্য
জীবনের হৃদয়ের একটি নিভৃত সুরকে প্রাধান্য দিয়ে এর ইতি টেনেছেন। জনা বলেছেন-
"ফিরি
যবে রাজপুরে প্রবেশিবে আসি,
নরেশ্বর,
‘কোথা জনা?'
বলি ডাক যদি,
উত্তরিবে প্রতিধ্বনি "কোথা জনা?’ বলি।’
এক পুত্র শোকাতুরা জননীর নাটকীয়
ভঙ্গিমায় সহানুভূতিহীন নিঃসঙ্গ মুহূর্তের মধ্যে বিগত জীবনের নিভৃত সুখ স্মৃতির
চিত্রকে ফুটিয়ে তোলে কবি সহৃদয় চিত্তকে গভীরভাবে আকর্ষণ করেছেন। সমস্ত কিছুকে ছাপিয়ে
এক পুত্র শোকাতুরা রমণী হৃদয়ের উষ্ণতাকে সঞ্চার করে মাইকেল অতীতের মধ্যে প্রাণ
প্রতিষ্ঠা করলেন; অতীত এখানে জীবন্ত অতীত হয়ে উঠেছে। বস্তুত- "মহাকবির
কল্পনাতে ছিল না সেই ছবি’- মধুসূদন সেই
ছবিই অঙ্কন করলেন। এখানেই জনা চরিত্রটি নতুন সৃষ্টি হয়ে উঠল- যা
গিরিশ ঘোষ পারেননি।
আমরা এখানে এটাই বলতে পারি
নবজাগরণের ছোঁয়া লাগলেও গিরিশ ঘোষের লেখনী যেখানে অন্ধ অনুকরণে নিয়োজিত ,মধুসূদনের
লেখনী সেখানে হৃদয়ের এক নতুন জগৎ সৃজনে সমর্থ।