Go to content

চন্দ ভবন: বিস্মৃতপ্রায় ইতিহাসের পুনরপাঠ

উত্তরসূরি
Skip menu
উত্তরসূরি
সাহিত্য পত্রিকা
Skip menu

চন্দ ভবন: বিস্মৃতপ্রায় ইতিহাসের পুনরপাঠ

New Project 2
চন্দ ভবন: বিস্মৃতপ্রায় ইতিহাসের পুনরপাঠ
ড. বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য
স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে অবিভক্ত সুরমা বরাক উপত্যকার যে দুটি জ্বলন্ত প্রদীপ ছিলেন তাদের নিয়ে পূর্বে আলোচনা-সমালোচনা কম হয়নি। কিন্তু আমরা আজও তার যথাযোগ্য মর্যাদা দিতে পারিনি। আবেগজড়িত ভাষণ আর স্বপ্নবিজড়িত কথা নিয়েই তুষ্ট হতে হয়েছে উপত্যকাবাসীকে। একদিন যারা স্বাধীনতা স্বপ্নের ধ্বজা উড়িয়ে উপত্যকাবাসীকে ঘুম থেকে জাগ্রত করেছিলেন, যাদের হাত ধরে দেশবরেণ্য নেতাগণ শিলচরে পাড়ি জমিয়েছিলেন তাদের কেন আজও আমরা উপযুক্ত মর্যাদা দিতে পারিনি সেই প্রশ্নটা বোধহয় আজ প্রত্যেকের মনে ওঠা উচিত।
    যাদের নিয়ে এই আলোচনা তারা হলেন দুই নেতা, পিতা ও পুত্র- কামিনীকুমার চন্দ এবং অরুণকুমার চন্দ। নেতা-আমলা না হয় বাদই দেওয়া যাক, বুদ্ধিজীবী-শিক্ষক-সাধারণ মানুষ আজও তাদের সঠিক মূল্যায়ন করতে পারেননি- এটা লজ্জার বিষয়। আমাদের ভাবনাকে আরও একটু এগিয়ে নিয়ে আরও একবার দেখতে চেষ্টা করি কেমন ছিলেন তাঁরা।
    আজকের শিলচর শহর আর স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় যে শিলচর তাতে রাত-দিন ফারাক। বৈদ্যুতিন বাতির বালাই ছিল না। রাস্তায় স্থানে স্থানে কেরোসিনের বাতি জ্বলতো। মোটর গাড়ির ব্যবহার তো নগণ্য ছিল। এমন অবস্থায়ও শিলচরে কারা আসেননি? বিপিনচন্দ্র পাল থেকে মহাত্মা গান্ধী, সুভাষচন্দ্র বসু প্রত্যেকের পদার্পণে ধন্য হয়েছিল শিলচর শহর। বিপিনচন্দ্র পাল তো একাধিকবার শিলচরে এসেছিলেন।
    প্রথমবার তিনি এসেছিলেন ব্রাহ্মধর্ম প্রাচরকরূপে ১৮৯৯ সালে। যদিও ব্রাহ্মধর্ম এখানে তেমন জনপ্রিয় ছিল না। গোঁড়া হিন্দুরা ব্রাহ্মাধর্মকে কখনও সুনজরে দেখতো না। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ দেবব্রত দত্তকে উদ্ধৃতি দিয়ে বলা যায়- ‘শোনা যায় নিজ গ্রামবাসী জনৈক ভদ্রলোকের বাড়িতে নিমন্ত্রিত হইয়া তাহাকে রান্নাঘরের বারান্দায় বসিয়া আহার করিতে হইয়াছিল, রাহ্মের সেই যুগে হিন্দু রান্নাঘরে প্রবেশের অধিকার ছিল না বলিলেই চলে।' এর থেকে সহজেই অনুমান করতে পারা যায় তৎকালীন কাছাড়ের ব্রাহ্মহ্মধর্মের অবস্থাটা কেমন ছিল।
    পরবর্তীকালে ১৯০৬ সালে তিনি পুনরায় শিলচরে আসেন রাজনৈতিক বক্তৃতা দেওয়ার জন্য। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনকে ঘিরে যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছিল তার ছোঁয়া কাছাড়েও (বরাক উপত্যকা) লেগেছিল। বিপিনচন্দ্র পালের নেতৃত্বে কাছাড়বাসীও অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। বরাক উপত্যকায় গান্ধীজীর আগমন একটি অবিস্মরণীয় ঘটনা। যে দুটি দিন তিনি শিলচরে ছিলেন তা ১৯২১ সালের ২৭ ও ২৮ আগস্ট। বিপিনচন্দ্র পালের পর তুমুল সাড়া জাগিয়ে যিনি এসেছিলেন তিনি অবশ্যই মহাত্মা গান্ধী। আর তা একমাত্র সম্ভব হয়েছিল দেশবরেণ্য নেতা দেশপ্রেমিক কামিনীকুমার চন্দ মহাশয়ের জন্যই। কারণ তখন তিনিই একমাত্র নেতা ছিলেন যিনি প্রত্যেক বছরই কংগ্রেসের অধিবেশনে যোগ দিতেন এবং এটাও স্মরণীয়, সর্বভারতীয় প্রত্যেক নেতার সঙ্গেই তার ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিল। গান্ধীজী অসহযোগ আন্দোলনকে লক্ষ্যে রেখেই এখানে এসেছিলেন, গান্ধীজীর আসার জন্য বিশেষ কোনও গাড়ির ব্যবস্থা করা হয়নি, এমনকি শেষ পর্যন্ত গান্ধীজীকে মালগাড়ির পেছনে লাগানো তিনটি কামরাতে বসেই শিলচর আসতে হয়েছিল। দেবব্রত দত্ত লিখেছেন, ‘রাত্রি দশটার সময় ট্রেন শিলচর এসে পৌঁছে। তখন স্টেশন লোকে লোকারণ্য। গান্ধীজী শিলচর এসে কামিনীকুমার চন্দের ভবনে ওঠেন।' কৃষ্ণদাস লিখেছেন, ‘আমরা এত শ্রান্ত ছিলাম যে মনে হচ্ছিল বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লে বাঁচি। গান্ধীজীকে দেখলাম বাড়ির বাচ্চাদের সঙ্গে ঠাট্টা তামাসা করে শরীর ও মনের ক্লান্তি দূর করে ফেললেন।'
    গান্ধীজী যেদিন শিলচরে আসেন কামিনীকুমার চন্দ চিকিৎসার জন্য কলকাতায় ছিলেন। তার অনুপস্থিতিতে বাইশ বছরের যুবক অরুণকুমার চন্দ তাঁকে অভ্যর্থনা জানান, যার ব্যবহারে মহাত্মাজী পর্যন্ত অভিভূত হয়েছিলেন।
    চা-বাগানের কয়েকজন সাহেব গান্ধজীকে দেখার লোভ সামলাতে পারেননি। জনারণ্যের মধ্যে আসতে না পেরে চন্দ ভবনের পাশ্ববর্তী বাড়ি রায়বাহাদুর হেমচন্দ্র দত্তের অন্দরমহলের মধ্য দিয়ে এসেছিলেন। গান্ধীজীর তেমন বড় কর্মসূচি ছিল না। ফাটক বাজারের এক জনসভায় তিনি ভাষণ দিয়েছিলেন। গান্ধীজী যাওয়ার সময় তাঁর একটি চটি ফেলে গিয়েছিলেন। ‘চটিটি চন্দ ভবনে সযত্নে রক্ষিত ছিল। এখন সেটা কোথায় জানি না।' (দেবব্রত দত্ত)
    ১৯০৬ সালের সুরমা উপত্যকার রাজনৈতিক সম্মেলনের প্রথম অধিবেশনের সভাপতি ছিলেন কামিনীকুমার চন্দ। দেবাশীষ দাস লিখেছেন, ‘১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে মতিলাল নেহরুর নেতৃত্বে রচিত ভারতের ভাবী সংবিধান যা পরবর্তীকালে নেহরু রিপোর্ট নামে পরিচিত, সেই রিপোর্টে অন্যতম স্বাক্ষরকারী ছিলেন কামিনীকুমার চন্দ।' শিলচর তথা কাছাড়বাসীও যে সেদিন সর্বভারতীয় স্তরে বিশিষ্ট স্থান অধিকার করেছিলেন এর থেকে অনুমান করতে পারা যায়। আর এই রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার সূত্র ধরেই উনবিংশ শতাব্দীর শেষ পর্বে মহানায়কদের মধ্যে যিনি এসেছিলেন তিনি আমাদের প্রিয় নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু। সুভাষচন্দ্র বসু দুইবার শিলচরে এসেছিলেন। ১৯৩৮ সালে যখন তিনি কংগ্রেসের সভাপতি হয়েছিলেন তখন সিলেট থেকে করিমগঞ্জ হয়ে শিলচরে এসেছিলেন। সে ঘটনার সাক্ষি হয়ে আছে অধ্যাপক দেবব্রত দত্তের লেখা ‘পৌরসভার ইতিহাস' গ্রন্থ। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায় অন্যান্য কংগ্রেস নেতাদের মতো সুভাষচন্দ্রও অবস্থান করেছিলেন চন্দভবনে। ‘পৌরসভার ইতিহাস' গ্রন্থে পাওয়া যায়- ‘স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রভাব ক্রমশ আমাদের পৌরসভার ওপরও প্রতিফলিত হয়েছিল। ১৯৩৭ সালে পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু এবং ১৯৩৮ সালে সুভাষচন্দ্র বসু শিলচরে এলে পরে পৌরসভা তাদের মানপত্র দিয়েছিল। এই ব্যাপারে পৌরসভা প্রত্যেকবারই একশত টাকা ব্যয় করেছিল। এই অভিনন্দন দেওয়া থেকে শিলচর তথা কাছাড়ে যে রাজনৈতিক চেতনাবোধ জাগ্রত হচ্ছিল এর আভাস পাওয়া যায়।'
    ১৯৩৮ সালে সুভাষচন্দ্র বসু আসার প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে জানতে পারা যায় তৎকালীন District student Organisation-এর সম্পাদক সুশীলরঞ্জন চক্রবর্তীর এক নিবন্ধে— ‘সুভাষচন্দ্র আসছেন শুনে সারা শহর তথা জেলা জুড়ে কী আনন্দ ও উত্তেজনা। তাঁকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য শহরের প্রধান রাস্তার মোড়ে মোড়ে তৈরি করা হল সুদৃশ্য তোরণ। সুভাষচন্দ্র রেল গাড়িতে এলেন। কারণ তখন তো এখনকার মতো কলকাতা থেকে শিলচরে বিমানে আসার সুবিধা ছিল না। তিনি শিলচর রেল স্টেশনে এসে পৌঁছলেন। তাঁর পরনে ছিল ধুতি-পাঞ্জাবি ও চাদর। মাথায় গান্ধী টুপি। শিলচর শহরের সকল গণ্যমান্য ব্যক্তিই সুভাষচন্দ্রকে অভ্যর্থনা জানাতে রেল স্টেশনে উপস্থিত হয়েছিলেন। কাছাড় জেলা কংগ্রেসের সভাপতি অরুণকুমার চন্দের সঙ্গে স্টেশন থেকে তার উকিলপট্টির বাড়িতে এসে উঠলেন। সেদিন বিকেলের দিকে এক জনসভার আয়োজন করা হল সদরঘাটে অর্থাৎ অভয়াচরণ পাঠশালার সামনের মাঠে। এখন যেখানে জনস্বাস্থ্য বিভাগের পানীয়জলের জলাধার আছে সেখানে তখন এক বিরাট মাঠ ছিল। শিলচরে তখনকার দিনে সব বড়ো বড়ো সভা এখানেই অনুষ্ঠিত হত। বিরাট সে মাঠে সেদিন তিল ধারণের জায়গা ছিল না। শহর ও গ্রামের প্রায় আশি হাজার লোক সভায় উপস্থিত হয়েছিলেন— সুভাষচন্দ্রকে দেখতে ও তাঁর কথা শুনতে। ইউরোপীয়ানদের উপস্থিতিও কম ছিল না। এ সভায় পৌরোহিত্য করেন অরুণকুমার চন্দ।'
    এতো গেল এক ইতিহাস। যার অপরিমেয় সত্তা চিরদিন গর্বিত করবে শিলচরের মানুষকে। কিন্তু এখানেই কি শেষ। না, শিলচরের মাটিকে পাদস্পর্শে ধন্য করেছিলেন রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্র নাথ ব্যানার্জি। যদিও তিনি রাজনীতির কোনও প্রচারে আসেননি, তিনি এসেছিলেন বন্ধুবর কামিনীকুমার চন্দের বাসায় বেড়াতে। দেশবন্ধু হওয়ার আগে চিত্তরঞ্জন দাশও একবার শিলচরে এসেছিলেন চন্দভবনে। দেবব্রত দত্তকে অনুসরণ করলে আরও জানতে পারা যায় যে বিবাহে আচার্যের কাজ করার জন্য শিবনাথ শাস্ত্রীও একবার এসেছিলেন। পণ্ডিত নেহরু পরিবারের সঙ্গে চন্দ পরিবারের ঘনিষ্ঠ যোগ ছিল।
    নিশীথরঞ্জন দাস লিখেছেন, ‘ইন্দিরা গান্ধীকে শান্তিনিকেতনে ভর্তি করার ব্যাপারে আলিপুর সেন্ট্রাল জেল থেকে জওহরলাল নেহরু ১৯৩৪ সালের ২৭এপ্রিল অনিল চন্দকে এক দীর্ঘ পত্র লেখেন। পত্রে সম্বোধন ছিল- ‘আমার প্রিয় চন্দ'। পত্রের ইতি টেনে ছিলেন ‘তোমার অন্তরঙ্গ জওহরলাল নেহরু'- বলে। অরুণ চন্দের যোগ্য সহধর্মিণী জ্যোৎস্না চন্দ ছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর অত্যন্ত কাছের মানুষ।
    মনোজকুমার দেব আসামের জনসংযোগের সঞ্চালক হয়ে একখানি অসমিয়া চটিবই প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন- ১৯৩৮ সালে শাদুল্লা মন্ত্রিসভা পতনে অরুণকুমার চন্দের মুখ্য ভূমিকা ছিল। গোপীনাথ বরদলৈ এবং অরুণকুমার চন্দের যুক্ত প্রচেষ্টাতেই শাদুল্লা মন্ত্রিসভা পতনের পরে আসামে প্রথম কংগ্রেসী মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়। এই উদ্দেশ্যে জাতীয় কংগ্রেসের নেতা মৌলানা আবুল কালাম আজাদ এবং তদানীন্তন সভাপতি সুভাষচন্দ্র বসু শিলং এসে অরুণ চন্দকে মন্ত্রিসভাতে যোগদান করতে অনুরোধ করেন। সেই বছরই কংগ্রেস সভাপতি সুভাষচন্দ্র বসু অন্যান্য কংগ্রেস নেতাদের সঙ্গে ‘চন্দ ভবনে' আথিত্য গ্রহণ করেন। চন্দের সভাপতিত্বে ঐতিহাসিক জনসভায় সুভাষচন্দ্র বসু অরুণকুমার চন্দকে ভারতের ‘উদীয়মান সূর্য' বলে অভিহিত করেন।
    এই স্বল্প পরিসরে বিস্তৃত ইতিহাস ব্যক্ত করা কখনও সম্ভব নয়। সবচেয়ে বিস্ময়ের ব্যাপার উপত্যকাবাসী অনেকেই এই তথ্য সম্পর্কে কিছুই জানেন না। তাই তো আজ পর্যন্ত সংরক্ষিত হল না চন্দভবন। শুধু প্রত্যাশার ফুলঝুরি ব্যতীত কিছুই উপহার দিতে পারলেন না আমাদের নেতা-মন্ত্রীরা। সুভাষচন্দ্র শিলচরে এসে বলেছিলেন- ‘Be strong in body, pure in spirit, resolute in will and sound in character. strength, purity and tenacity are necessary to buildup character.' আসলে এই নেতার কথা আজকের নেতাদের চরিত্রে খুঁজে পাওয়াই ভার।


Created with WebSite X5
LOREM IPSUM
Lorem Ipsum
Dolor sit amet, 12
12345 Consectetur (Adipiscing)
+00 012 345 678  | +00 012 345 678 (fax)
info@example.com
BLOG
DESIGN
Back to content