Go to content

ছৌ নাছ: একটি মরমীয়া অবলোকন

উত্তরসূরি
Skip menu
উত্তরসূরি
সাহিত্য পত্রিকা
Skip menu

ছৌ নাছ: একটি মরমীয়া অবলোকন

New Project 2
ছৌ নাছ: একটি মরমীয়া অবলোকন
অপর্ণা দেব
বছর দুয়েক আগে শ্রীভূমি (করিমগঞ্জ) শহরের ‘কুশিয়ারকূল ক্লাব' তাঁদের ‘দুর্গোৎসবের সুবর্ণ জয়ন্তী বছর' পূর্ণ করে। এই সুবর্ণ জয়ন্তী বছর উদযাপনে উৎসব কমিটির পক্ষ থেকে সুদূর পুরুলিয়ার ‘ছৌ নাচের দল' এনে করিমগঞ্জবাসীকে ‘ছৌ নৃত্য' দর্শনের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। অনুষ্ঠান চলাকালীন অনেকের বহু প্রশ্ন মনে এসেছে। আবার অনেকেই এই নাচ সম্পর্কে একেবারেই অবগত না থাকার ফলে, বুঝে নিতে বেগ পেতে হয়েছে। যদিও বেশ ক-বছর আগে ২০১০ সনে করিমগঞ্জ শহরের  ‘চারণিক' সংস্থার পক্ষ থেকে ‘ছৌ' নৃত্য মঞ্চে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করেছিলেন এবং খুব সম্ভব সেটি ছিল উত্তর পূর্বাঞ্চলের মধ্যে  প্রথম ‘ছৌ নৃত্যের' পরিবেশনা। সেবারও শিল্পীদের পরিবেশনা আমাদের মুগ্ধ করেছিল। ব্যক্তিগত পরিসরে আমার সব ধরনের নাচ ভালো লাগলেও ‘ছৌ নৃত্য', ‘কথাকলি নৃত্য' এবং ‘বাংলার রায়বেশে নৃত্য’- যেগুলো বাংলার ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির ধারক, এই সবগুলো নাচের বিষয়ে ব্যক্তিগতভাবে বরাবরই আমি অতিমাত্রায় আগ্রহী। আজ ছৌ নাচ বা ছৌ নৃত্য নিয়ে সামান্য ও অতি সংক্ষেপে দু-চার কথা।
    ‘ছৌ' হলো একটি বিশেষ ধরনের নাচ, পূর্ণ প্রাণশক্তিসম্পন্ন নৃত্য আঙ্গিক যা পরিচর্চা ও কঠিন অনুশীলন দাবি করে। এই নাচের মূল চ্যালেঞ্জিং ব্যপার হলো বিশালাকৃতির মুখোশ পরিধানে নৃত্য পরিবেশন করা। যা অত্যন্ত পরিশ্রম ও কঠিন অধ্যবসায় ফলেই সম্ভব। ইতিহাসের দিক দেখলে এই নাচের বিবরণ অনেকটা এরকম পাওয়া যায়।
    ছৌ নাচের বুৎপত্তি সম্পর্কে আমরা জানতে পার, এটি পূর্বভারত অঞ্চল থেকে উদ্ভূত একটি নৃত্য শৈলী। এটি সংস্কৃত ‘ছায়া' থেকে উদ্ভূত বলে ধরা হয়। কেউ কেউ অবশ্য মূল সংস্কৃত চাদমা অর্থাৎ ছদ্মবেশ- এর সাথে যুক্ত করে। তবে গবেষক সীতাকান্ত মহাপাত্রের মতো অন্যরা  এটিকে ওড়িয়া ভাষায় ‘ছাউনি' থেকে নেওয়ার কথা বলেন। আবার গবেষক রাজেশ্বর মিত্রের মতে তিব্বতী সংস্কৃতির ছাম নৃত্য থেকে ছৌ নাচের উদ্ভব ঘটেছে। ড. সুকুমার সেনের মতে শৌভিক বা মুখোশ থেকে নাচটির নামকরণ ছৌ হয়েছে। কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রবীন্দ্র অধ্যাপক ড. আশুতোষ ভট্টাচার্য সর্বপ্রথম ছ বা ছো নাচের বদলে ‘ছৌ' নামে অভিহিত করেন এবং বিদেশে এই নাচের প্রদর্শনের ব্যবস্থা করার পরে এই নাচ ছৌ নাচ নামে জনপ্রিয় হয়ে পড়ে। প্রচলিত কুড়মালী ভাষায় ছুয়া বা ছেলে থেকে এই নাচের নামকরণ হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন, কারণ ছৌ প্রধানতঃ ছেলেদের নাচ।
    ছৌ নাচ বা ছো নাচ বা ছ নাচ ভারতের একপ্রকার উপজাতি নৃত্য বা আদিবাসী যুদ্ধ নৃত্য। আমরা জেনে এসেছি ছৌ নাচের আদি উৎপত্তি স্থান পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া জেলায়। উৎপত্তি ও বিকাশ অনুযায়ী ছৌ নাচের তিনটি ভাগ বা উপবর্গ রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া ছৌ, ঝাড়খণ্ডের সেরাকেল্লা ছৌ এবং উড়িষ্যার ময়ূরভঞ্জ ছৌ।
    পুরুলিয়া ছৌ-এর উৎপত্তি স্থল পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া জেলায়, সরাকেল্লা ছৌ, খরসোয়া জেলার সদর সরাইকেল্লায় এবং ময়ূরভঞ্জ ছৌ-এর উৎপত্তি স্থল উড়িষ্যার ময়ূরভঞ্জ জেলায়। এই তিনটি উপবর্গের মধ্যে প্রধান পার্থক্য যেটি দেখা যায় সেটি হলো মুখোশের ব্যবহার। সরাইকেল্লা ও পুরুলিয়া ছৌ-তে  মুখোশ ব্যবহৃত হলেও, ময়ূরভঞ্জ ছৌ নাচে মুখোশের ব্যবহার নেই।
    আমরা দেখেছি ছৌ নাচে মুখোশের প্রধান এবং বিশেষ ভূমিকা থাকে, পরিবেশিত পালা-তে চরিত্রের চিহ্নিতকরণ হয় এই মুখোশের মাধ্যমেই। এই ছৌ নাচের বিশালাকার মুখোশগুলো তৈরি হয় মূলত কাগজের মণ্ড, কাপড় আর কাদামাটি দিয়ে। নানান প্রক্রিয়া ও পদ্ধতির মধ্য দিয়ে গিয়ে মুখোশ তার চুড়ান্ত রূপ পায়। প্রথম কাদামাটি দিয়ে মুখোশের কাঠামো বা ছাঁচ বানিয়ে নেওয়া হয়। সূর্যের আলোয় তা শুকিয়ে শক্ত করা হয়। মুখের আদল তৈরি হয়ে যাওয়ার পর চরিত্রের দাবি অনুযায়ী মুখোশগুলো সাজিয়ে তোলা হয়। পালার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী মুখোশের আকৃতি ও রূপ তৈরি করা হয়।
    ছৌ নাচ নিয়ে বিশেষজ্ঞরা বহু মত বা অভিব্যক্তি ব্যক্ত করেছেন। এই নাচের ব্যাখ্যা স্থান বিশেষে বদল হয়ে এসেছে। যেমন, আমরা পাই বাংলার পুরুলিয়া ও মেদেনীপুরে ছৌ-এর অর্থ হলো ‘ঢঙ'। অনেক বিশেষজ্ঞদের মতে ছৌ নৃত্য আবার ‘ছয় নাচের সমাহার'। প্রচলিত উড়িষ্যা ভাষায় ছৌ শব্দের অর্থ অনেকটা এরকম, ‘গোপনে শিকারের অনুসরণ করা'। ছৌ নাচের অনুষ্ঠানের সময় বিশেষ দক্ষতা সম্পন্ন শিল্পীরা বাজান কিছু ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র। এর মধ্যে রয়েছে ধামসা (গম্ভীর আওয়াজের তালবাদ্য) ঢোল এবং সানাই।
    আমাদের বাংলাভাষা ও সাহিত্যের ঐতিহ্য হাজার বছরের পুরোনো। ভারতীয় উপমহাদেশের এই অঞ্চলে রয়েছ স্বকীয় ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতি। এরমধ্যে বাংলার ভূমি পৃথিবীর সমৃদ্ধ সংস্কৃতির ধারণকারী দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। বাংলার সংস্কৃতি বলতে আমরা সধারণতঃ বুঝি দক্ষিণ এশিয়ার একটি দেশের গণমানুষের সাহিত্য, সঙ্গীত, নৃত্য, ভোজনরীতি, পোষাক, উৎসব, ইত্যাদির মিথস্ক্রিয়াকে বোঝানো হয়ে থাকে। বাংলার সংস্কৃতি স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের জন্য স্বমহিমায় উজ্জ্বল। আর এই স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের একটি অন্যতম সৃষ্টি হলো ‘ছৌ নাচ'।
    ছৌ বা ছো নাচ ভারতীয় আদিবাসী এই নৃত্য একপ্রকার যুদ্ধ নৃত্যের পর্যায়ে আবদ্ধ। এটি মার্শাল আর্ট, আ্যক্রোব্যাটিস্ক এবং অ্যাথলেটিক্স উদযাপন থেকে শুরু করে একটি লোকনৃত্যের থিমগোলোয় সঞ্চারিত। শৈব ধর্ম, শাক্ত ধর্ম ও বৈঞ্চব ধর্মের নির্বাচিত কিছু অংশ বা থিম নিয়ে এই নাচ পরিবেশিত হয়। এই পরিবেশনায় মূলত: দুষ্টের দমন ও ধর্মের জয়  দেখানো হয়।
    এছাড়া আরও বিভিন্ন প্রকার ছৌ নাচের উদ্ভবের  ইতিহাস আমরা পাই। প্রথম নাম হিসেবে ‘কৈড়া ছো' নাচের উদ্ভবের নাম আমরা পাই। এই ‘কৈড়া ছৌ' নাচের পরে ‘আলাপ ছো' বা ‘মেল ছো' নাচের উদ্ভব হয়। এই নাচে মুখোশ ছাড়া দু-জন বা চারজন নর্তক একসাথে নাচতেন। এছাড়াও সম্ভ্রান্ত বাড়ির নর্তকরা আড়ম্বরপূর্ণ সাজপোশাক পরে ‘বাবু ছো' নামক একপ্রকার নাচের প্রচলন করেন। এই নাচে ধুয়া নামক ছোট ঝুমুর গান গাওয়া হয়ে থাকে। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৩০ এর দশকে ‘পালা ছো' নাচের সৃষ্টি হয়।
    ছৌ নাচ বিষয়গতভাবে মহাকাব্যিক। এই নাচে রামায়ণ ও মহাভারতের বিভিন্ন উপাদান অভিনয় করে দেখানো হয়। কখনও কখনও অন্যান্য পৌরাণিক কাহিনিও অভিনীত হয়। এই নাচের মূল রস হলো বীর ও রুদ্র। এই পালা শুরুর আগে ঝুমুর গানের মাধ্যমে পালার বিষয়বস্তু বুঝিয়ে দেওয়া হয়। গান শেষ হলে বাদ্যকারেরা বাজনা বাজাতে বাজাতে নাচের পরিবেশ সৃষ্টি করেন। প্রথম গণেশের বেশধারী নর্তক নাচ শুরু করবেন। তারপর অন্যান্য দেবতা-অসুর, পশু-পাখির বেশধারী নৃত্যশিল্পীরা  নাচের আসরে প্রবেশ করেন। ছৌ নাচে মুখে মুখোশ থাকার ফলে মুখের অভিব্যক্তি প্রতিফলিত হয় না বলে শিল্পী অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কম্পন, সঙ্কোচন ও প্রসারণের মধ্য দিয়ে চরিত্রের অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন। ছৌ নাচের অঙ্গ সঞ্চালনকে মূলত পাঁচ ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে মস্তক সঞ্চালন, স্কন্ধ সঞ্চালন, বক্ষ সঞ্চালন, উল্লম্ফন এবং পদক্ষেপ। বাজনার তালে তালে হাত ও পায়ের সঞ্চালন কে ‘চাল' বলা হয়। ছৌ নাচে এই ‘চালের' আবার বেশ কয়েকটি ভাগ আছে। যেমন দেবচাল, বীরচাল, রাক্ষসচাল, পশুচাল প্রভৃতি বিভিন্ন রকমের চাল আছে। চালগুলো ডেগা, ফন্দি, উড়ামালট, উলফা, বাঁহি মলকা, মাটি দলখা প্রভৃতি বিভিন্ন বিভাগেও বিভক্ত।
    তথ্য মতে জানা যায় পুরুলিয়া মফস্বল থানার কিছু গ্রাম গেঙ্গাড়া, ডিমডিহা ও কালীদাসডিহি গ্রামে, পুঞ্চা নামে একটি থানার জামবাদ গ্রামে এবং কেন্দা নামক থানার কোনাপাড়া গ্রামে ছৌ নাচের মুখোশ তৈরি হয়ে থাকে।
    ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দে কুপল্যাণ্ডের ‘ডিস্ট্রিক্ট গ্যাজেটিয়ার’ মানভূম গ্রন্থে- ‘ছৌ' নাচের কোনও উল্লেখ না থাকায় অনেকে মনে করেন ১৯১১ সনের পর ছৌ নাচের উদ্ভব হয়েছে। মানভূম গবেষক দিলীপ কুমার গোস্বামীর মতে শিবের গাজনে মুখে কালি মেখে বা মুহা বা মুখোশ পরে  নাচকেই ছৌ নাচের আদি রূপ বলে ।
    ছৌ শিল্পীরা সারা চৈত্র মাস ধরে অনুশীলন করে  থাকেন। চৈত্র সংক্রান্তির দিন থেকে শুরু করে সারা বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ মাসের তেরো তারিখে অনুষ্ঠিত ‘রহিন উৎসব' পর্যন্ত ছৌ নাচ নাচা হয়ে থাকে। এখনো পুরুলিয়া জেলায় শিবের গাজন উপলক্ষে ছৌ নাচের আসর বসে।
    এটা ঠিক, এই নাচ ঐতিহ্যগতভাবে বিশেষ করে প্রতি বছর বসন্ত কালে উদযাপিত হয় এবং এটি একটি সমন্বিত নৃত্য ফর্ম যা শাস্ত্রীয় নৃত্য এবং প্রাচীন আঞ্চলিক উপজাতির ঐতিহ্যের সংমিশ্রণ থেকে উদ্ভূত। ছৌ নৃত্য বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটের লোকদের উৎসব ও সমন্নয়ের উৎসব। এই উৎসব সমন্নয়ের চেতনা ও পারস্পারিক প্রেম-ভালোবাসায় সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ করে সবাইকে একত্রিত করে।


Created with WebSite X5
LOREM IPSUM
Lorem Ipsum
Dolor sit amet, 12
12345 Consectetur (Adipiscing)
+00 012 345 678  | +00 012 345 678 (fax)
info@example.com
BLOG
DESIGN
Back to content