এখন তমসা
Published by কৃষ্ণা মিশ্র ভট্টাচার্য in প্রথম পর্ব, দ্বিতীয় সংখ্যা, অক্টোবর ২০২৫ · Friday 31 Oct 2025 · 9:00
Tags: ছোটোগল্প
Tags: ছোটোগল্প
এখন তমসা
কৃষ্ণা মিশ্র ভট্টাচার্য
রাত কত প্রগাঢ়— চাপ চাপ অন্ধকার, জেনানা সেলের ভেতরে ও বাইরে এবং তবাসুমের মনে কিছুক্ষণ আগেই সেন্ট্রি
বদল হয়েছে; রাতের খাওয়া শেষ হয়েছে আরও আগে, উপরে একটি বাল্ব জ্বলছে— যা আলো থেকে অন্ধকার ছড়াচ্ছে অনেক বেশি। গতকাল
রাতে নিজের পরনের শাড়ি খুলে ঝুলে পড়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে সবিতা নামের এক কয়েদী
এখন হাসপাতালে। তবাসুম এর কানের কাছে ফিসফিস করে পুনম বলেছিল— "মর
যায় তো শান্তি। আর বচ যায় তো ফিরসে ইয়ে জেল।’
"হুঁ। তুমি জেলে কেন পুনম বহিন? তোমাকে তো আমাদের মত জুগ্গির ঔরত বলে মনে হয়
না—'
পুনম গম্ভীর হয়ে বলেছিল—
"নেঁহি। তু নে সহি বোলা— মেঁ জুগ্গি মে রহনেওয়ালি নেঁহি হুঁ।’
"তাহলে তুমি কেন এখানে এলে দিদি? এটা তিহার জেল—
লোহার গরাদ ঘেরা সেলের পর সেল জুড়ে কত করুণ কান্নার, কত অপরাধ— কত জীবন তিলে তিলে শেষ হয়ে যাওয়ার বিষণ্ণ, ভয়াবহ কাহিনি; এটা তিহার জেল। কত রাজনৈতিক বন্দিদের না বলা কাহিনি এই লোহার গরাদ ধরে রেখেছে—
এটা তিহার জেল—
"তাহলে তুমি কেন এখানে এলে দিদি? এটা তিহার জেল—
লোহার গরাদ ঘেরা সেলের পর সেল জুড়ে কত করুণ কান্নার, কত অপরাধ— কত জীবন তিলে তিলে শেষ হয়ে যাওয়ার বিষণ্ণ, ভয়াবহ কাহিনি; এটা তিহার জেল। কত রাজনৈতিক বন্দিদের না বলা কাহিনি এই লোহার গরাদ ধরে রেখেছে—
এটা তিহার জেল—
"মুঝে পতা হ্যাঁয়—ও এক লম্বী
কাহানি—'
"কিতনি লম্বি? শীতের শেষ না হওয়া রাত? নাকি বর্ষার ছাদের ফুটো
দিয়ে গল গড়ানোর ল-ম্বি রাত—'
"ছাদ?’ এবার তবাসুম খিলখিল হেসে উঠল।
পুনম অবাক হয়ে তবাসুমের দিকে তাকিয়ে বলল
"আরে, তু পাগল হ্যাঁয় ক্যা? হস কিঁউ
রঁহি?’
তবাসুমের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। মাথার উপর একটু ছাদ— একটু
ছাদের আশ্রয়ের জন্য তবাসুম আর অমিত একটি গাঁয়ের দুটি সদ্য
তরুণ আর তরুণী- "আমরা দুজন একটি গাঁয়ে
থাকি সেই আমাদের একটি মাত্র সুখ— আমরা
দুজন গাঁয়ের একটি স্কুলে ক্লাস টেনে পড়ি— এই আমাদের একটি মাত্র সুখ—'
আমরা দুজন ক্লাসের পড়া শেষে ভাগীরথীর জলে নৌকো ভাসাই—সেই আমাদের একটি মাত্র সুখ—'
আমরা দুজন ক্লাসের পড়া শেষে ভাগীরথীর জলে নৌকো ভাসাই—সেই আমাদের একটি মাত্র সুখ—'
আমরা দুজন ভাসিয়া এসেছি যুগল প্রেমের স্রোতে
অনাদি কালের—'
অনাদি কালের—'
সেলের বাইরে সিকিউরিটি কনষ্টেবল এর হুঙ্কার "আরে ইধার ক্যায়া হো রহা হ্যাঁয়? তুম লোগ আভি তক শোয়া নেঁহি?’ পুনম হেসে বলল—"আরে ম্যাডাম, হাম জরা সুখ দুখ কি বাঁতে কর রঁহে —ইয়ে ভি না মুমকিন হ্যাঁয় ক্যা?’
লেডি সেন্ট্রি ব্যাটন লোহার গরাদে রেখে
বলল— "পুনম জী, আপকো তো আভি আভি পুলিশ কাষ্টডি সে
জেল কাষ্টডি হুয়া— দো দো খুন কা আরোপ হ্যায় আপ
পর— ফির ভি আপ হাসতে হো?’
তবাসুমের চোখ বিস্ময়ে
গোলাকৃতি হয়ে উঠল।
"খুন!’
পুনম জোরে হেসে বলল—"আরে ইয়ে লেড়কি কো দেখো! পুলিশ দিদি— এ তো মনে হচ্ছে ভিরমি খাবে।’
পুনম জোরে হেসে বলল—"আরে ইয়ে লেড়কি কো দেখো! পুলিশ দিদি— এ তো মনে হচ্ছে ভিরমি খাবে।’
লেডি সেন্ট্রি এবার ব্যাটন হাতে
নিয়ে বলল— "ইয়ে বেচারী তো ফাঁস গয়ি। এতো কোনও কিছু না
করেই জেল কাষ্টডিতে।’
পুনম অবাক হয়ে বলল—"ও
ক্যায়সে—'
‘আরে অব শো যা—বহুত রাত হো চুকি— কাল তুমহারা দোনো
কা কেস কোর্ট পে পেশ হোগি—'
রাতের গভীর তারা দেখা যায় না—এমনই বন্দীশালায় দুই নারী— ঘুমিয়ে পড়ে—শীতের রাতে একটি জীর্ণ ছারপোকা জনিত কম্বলকে
গায়ে জড়িয়ে—
রাতের গভীর তারা দেখা যায় না—এমনই বন্দীশালায় দুই নারী— ঘুমিয়ে পড়ে—শীতের রাতে একটি জীর্ণ ছারপোকা জনিত কম্বলকে
গায়ে জড়িয়ে—
ত্রিযামা রাত গল্প বলে— তবাসুমের গল্প। তবাসুম আর অমিত
মণ্ডলের গল্প। তবাসুম আর অমিত এক গাঁয়ের
বাসিন্দা— তবাসুম ভালোবেসেছিল
অমিতকে।
"কিন্ত আমাদের ভালবাসা তো মেনে নেবে না কেউ—'
-"তারপর আমরা পালিয়ে আসি—। কাউকে কিছু না জানিয়ে একদিন ভাগীরথীর তীরের সেই গ্রাম থেকে নৌকা করে পালিয়ে এলাম পলাশী—'
"কিন্ত আমাদের ভালবাসা তো মেনে নেবে না কেউ—'
-"তারপর আমরা পালিয়ে আসি—। কাউকে কিছু না জানিয়ে একদিন ভাগীরথীর তীরের সেই গ্রাম থেকে নৌকা করে পালিয়ে এলাম পলাশী—'
"পলাশী—যাঁহা ঘামাসান লড়াই হুয়া থা আংরেজ
ঔর নবাব সিরাজ—'
"হ্যাঁ, গো ওখানেই। পলাশী থেকে বাস ধরে কলকাতা— কলকাতা থেকে দিল্লি—'
"বাপ রে! এতো অনেকটা পথ।’
তবাসুম কম্বল গায়ে
জড়িয়ে বলল- "অনেকটা’
"হুম। তারপর—'
"আচ্ছা পুনম দিদি তুমি আমার ভাঙ্গা ভাঙ্গা বুলি বুঝতে পারো?’
"কুছ কুছ সমঝ মেঁ আ যাতে— তু তো
বাংলা বলতি হ্যায়, না?’
"হু। আর এজন্যই তো— আচ্ছা দিদি তুমি তো বললে না—তুমি
এই জেলখানায় কি করে এলে?’
পুনম কম্বল টা গা থেকে
সরিয়ে পায়ের কাছে টেনে নিয়ে বলল—"খুন করে—!’
"খুন! কা—কাকে— "বিস্মিত
তবাসুম আর কিছু বলতে পারে না— পুনম নির্বিকার জবাব দেয়
"আমার হাজব্যান্ডকে প্রথম খুন করেছি— তারপর’
"মানে তোমার স্বামীকে? কেন কেন দিদি— স্বামীকে—'
"দেখ, প্যান প্যান করিস না—আমার স্বামীর একটি কাপড়ের
দোকান-মানে বিজনেস ছিল- সে বেশি লাভের আশায়, আমাকে এক ক্লায়েন্টের কাছে একরাতের জন্য বন্ধক রেখেছিল—'
তবাসুম হাঁ করে
অন্ধকারে তাকিয়ে বলল-
"কি বলছো— দিদি— এরকম হয়—! আমার অমিত—খেটে
খেটে —"ডুকরে কেঁদে উঠল তবাসুম
বিরক্ত সুরে পুনম
বলল-
"আরে রো কিঁউ রহি হো! মুঝে ইয়ে
রোনা ধোনা বিলকুল পসন্দ নেঁহি হ্যাঁয়—চুপ
হো যা—'
আর আরেক জন— কাকে?’
তাচ্ছিল্যের গলায় পুনম
জবাব দিল
"কিঁউ? উস ক্লায়েন্ট কো ভি ম্যাঁয়নে মার দিয়া—'
তবাসুম আবার ডুকরে কেঁদে উঠে বলল
"দিদি গো তোমার যদি ফাঁসি হয়ে যায়?’
"আরে ইয়ার, তু মেরে লিয়ে রো রহি হ্যাঁয়? তু তো মুঝে জানতি তক্ নেঁহি!’
তবাসুম ফুঁপিয়ে
কেঁদে উঠল।
অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে তবাসুম এর গায়ে হাত রেখে পুনম বলল— "মেঁ
রাজস্থান কি লেড়কি হু, ইজ্জত কে লিয়ে হম জান দে ভি সকতি হ্যাঁয়, ঔর লে ভি সকতি হ্যাঁয়। ছোড় মেরি বাঁত।
তোর কথা বল! তোর আর অমিতের ভালবাসার কাহিনি। সারাজীবন কেটে গেল
তবাসুম— ভালবাসাকে খুঁজতে খুঁজতে— দেখা পেলাম না—
তোর ভালবাসার গল্প বল—'
কতদিন পর গন্ধ নামে
গোলাপের গালে
কতদিন পর বর্ষা
নামে রাইসিনার খাঁজে খাঁজে
কতদিন পর আকাশ গান্ধার কোমল নিষাদে বেজে ওঠে—
রাজধানী দিল্লির একটি
জুগ্গির প্লাষ্টিক শিটের আচ্ছাদনে
শুরু হয়েছিল তবাসুম আর অমিতের
ভালবাসার যুগলবন্দী। অমিত এক নামকরা ঠিকেদারের আন্ডারে রাজমিস্ত্রীর কাজ করে; আর যেহেতু সে ক্লাস টেনথ পর্যন্ত পড়েছে সুতরাং সে
অনেক সময় হিসেব রাখার কাজটি ও করত—
ভালই উপার্জন হতো। দুজনের সংসার ভালই চলছিল। রাতে
দুজনে গল্প করতে করতে খাবার খেতো—
"তবাসুম, সিগ্গিরই আমি একটা নিজের মাথা গোঁজার আস্তানা করব— তুই দেখে নিস।’
অমিত রুইমাছের মুড়ো দিয়ে
মুড়িঘন্ট খেতে ভালবাসে— আরেকটু তরকারি এবং মুড়ো টা অমিতের পাতে দিয়ে
বলল
"তুই কি পাগল হলি? এতো টাকা—'
"সে আমি ঠিক জোগাড় করে নেবো। তা বলে তুই পুরো মুড়ো টা আমায় দিয়ে
দিলি’ বলে আধখানা মুড়ো ওর পাতে তুলে দেয়।
পুনম অন্ধকারে ফিকে হাসল— "তোর ভাগ্য খুব ভাল রে তবাসুম।’
"কেন দিদি? তোমার বর-’
"আমার বর? মানে আমার হ্যাজবেন্ড? জীবনে কোনদিন দেখেনি আমি
কি খেলাম, না খেলাম— আমিই পাঁচব্যঞ্জন
রান্না করে মুখের সামনে খাবার তুলে দিতাম—
রাতে আকন্ঠ মদ গিলে এসে বিছানায় আমার শরীরটা নিয়ে
ধামসাতো— তারপর— নাক ডাকিয়ে ঘুমোতো—
যানে দে— তু তেরা কাহানি বোল—'
পুরুত কিংবা কাজী ডেকে বিয়ে হয় নি ওদের; তবাসুম নিজের মনের সঙ্গে কথা
বলে-
"জানো, দিদি অমিত— বলেই শুধরে দিয়ে বলে- আমার অমিত—'
"জানো, দিদি অমিত— বলেই শুধরে দিয়ে বলে- আমার অমিত—'
পুনম হেসে বলে— "হাঁ, হাঁ, তোরই অমিত— আগে বোল—'
"অমিত বলত- তবাসুম, মআমাদের বিয়ের সাক্ষী থাকবে না কোনও পুরুত, কোনও কাজী— আমাদের বিয়ের সাক্ষী আমাদের দুই হৃদয়— তারপর আমার বুকে হাত দিয়ে বলেছিল- "যদিদং
হৃদয়ং তব—’ তারপর নিজের বুকে হাত দিয়ে বলেছিল- "তদিদং হৃদয়ং মম—'
"ইয়ে তো সংস্কৃত্—'
গর্বের সুরে তবাসুম বলে— "আমার অমিত লেখাপড়ায় খুব ভাল ছিল দিদি। আমার জন্য— আমার জন্য ওর জীবন টা
বরবাদ হয়ে গেল! না, আমাকে ভালবাসত, না ওকে গ্রাম ছাড়তে হতো! আমি একটা অভাগী, অপয়া—’ তবাসুম আবার ডুকরে কেঁদে ওঠে।
বিরক্তির সুরে পুনম— "ফির সে–'
চোখের জল শাড়ির আঁচলে মুছে তবাসুম বলতে শুরু
করে—
অমিত সিঁদুর, শাঁখা, পলা ইত্যাদিতে
বিশ্বাস করতো না— কিন্ত তবাসুম পছন্দ করত সাজতে— তাই
শঙ্খ, সিঁদুর প্লাস্টিকের, নোয়ায় সেজে থাকত তবাসুম। অমিত হেসে বলত-
"তোকে সুন্দরী বধূ লাগছে— ওগো
বধূ সুন্দরী’ বলে থুতনি নেড়ে আদর করে দিত।
"শালী, তু যায়গি ক্যায়সে নেঁহি— মেরা ক্লায়েন্ট হ্যাঁয় বিক্রম ভাঈয়া— এক রাত কে লিয়ে তু উসকি হ্যাঁয়— "পুণমের থুতনি, চুলের মুঠি ধরে টানতে টানতে ওদের
বেডরুমে ঢুকিয়ে দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে দিয়েছিল পুণমের বর। ভেতরে
মোমের আলো, গোলাপের সৌরভ ফুলদানিতে আতরের সুগন্ধি নিয়ে অপেক্ষারত বিক্রম শেঠ।
তারপর— কেউ অন্ধকারে
কাউকে দেখতে পাচ্ছে না। তবাসুমের দীর্ঘশ্বাস ফেলার শব্দ কানে এলো পুনমের।
সুখের দিনগুলি বড্ড তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে গেল গো পুনম দিদি। আমাদের কোলে এলো
আমাদের ছোট্ট সোনা— অমিত
কুমারের ছেলে রাজকুমার।
আমাদের ছোট্ট সোনার যখন এক বছর বয়স— তখন-তখনই ঘটে গেল সেই ভয়ংকর দুর্ঘটনা। আর আমার জীবনের নেমে এলো অমানিশা।
বিকেলে ছেলেকে ঘুম পাড়িয়ে সুন্দর একটি শাড়ি পরে তবাসুম অমিতের জন্য অপেক্ষা করছিল। আজ অমিতের খাতা লেখা নেই, সুতরাং তাড়াতাড়ি চলে আসবে— এরকম টাই বলে গিয়েছিল; কিন্ত হাওয়ার আগে যেন ভেসে এলো দুঃসংবাদ। কনষ্ট্রাকশন সাইট থেকে একটি ফোন কল-অমিতের নাম্বার থেকে—
আমাদের ছোট্ট সোনার যখন এক বছর বয়স— তখন-তখনই ঘটে গেল সেই ভয়ংকর দুর্ঘটনা। আর আমার জীবনের নেমে এলো অমানিশা।
বিকেলে ছেলেকে ঘুম পাড়িয়ে সুন্দর একটি শাড়ি পরে তবাসুম অমিতের জন্য অপেক্ষা করছিল। আজ অমিতের খাতা লেখা নেই, সুতরাং তাড়াতাড়ি চলে আসবে— এরকম টাই বলে গিয়েছিল; কিন্ত হাওয়ার আগে যেন ভেসে এলো দুঃসংবাদ। কনষ্ট্রাকশন সাইট থেকে একটি ফোন কল-অমিতের নাম্বার থেকে—
‘হ্যালো, অমিত—'
"আপ ক্যায়া অমিত কি বিবি বোল রহি হ্যাঁয়—'
‘হাঁ, হাঁ।’
"আপ জলদি রামমনোহর লোহিয়া হাসপাতাল কা ইমার্জেন্সী ওয়ার্ড পেঁ আ
যাইয়ে—
অমিত কা এক বড়া এক্সিডেন্ট হো গিয়া—'
সাদা কাপড়ে ঢেকে দিল
ওরা। আমার অমিত হারিয়ে গেল।—
আমার চোখের জল
শুকিয়ে আগুন জ্বলে উঠল
"কেন আমার অমিত উপর থেকে পড়ে গেল?
"কেন বহুতল বাড়িতে কাজ করার সময়, শ্রমিকের নিরাপত্তার ব্যবস্থা কেন করা হয়
নি?’
"কেন, সময়মতো এম্বুলেন্স ডাকা হয়নি?’
তবাসুমের চোখের আগুনের ফুলকি ছড়িয়ে পড়েছিল আরো, আরো অনেকের
চোখে— ওরা আমার অমিতের শবদেহ আঁকড়ে বলেছিল-
"যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের এফ আই আর না নেওয়া হবে, আমরা এই
শবদেহ দাহ করতে দেবো না—'
তারপর-
তবাসুমের চোখে সেই দৃশ্য এখনও নরকের কুন্ডলি বানায়—
তবাসুমের চোখে সেই দৃশ্য এখনও নরকের কুন্ডলি বানায়—
নোনা মাটির উপর সেই সব শোক
গাঁথা
উড়ালপুলের অন্ধকারে
খুলে রাখা আততায়ীদের ছদ্মবেশ।
"আমার ছেলের জন্য—আমার একবছরের ছোট্ট সোনার জন্য একটি আপেল—
সে আপেল খেতে চেয়েছিল—।
"কি হয়েছিল—?’
ওরা আমাদের কথা দিয়েছিল
ভালকরে তদন্ত হবে-আমরা যেন অমিতের দেহ ছেড়ে দিই—'
পোষ্ট মর্টেম আদৌ
হয়েছিল কিনা জানি না— অমিতের দেহ
শ্মশানের চিতায় পুড়ে ছাই হয়ে গেল। তবাসুম সারাদিনের ক্লান্তি, শোক, বেদনা বুকে
নিজের ছোট্ট রাজকুমার কে জড়িয়ে শুয়ে পড়েছিল। শেষরাতে
হঠাৎই বহুকন্ঠের— "আগুন, আগুন— "চিৎকারে ঘুম ভেঙ্গে ছুটে বাইরে বেরিয়েই আতঙ্কে শিউরে ওঠে
তবাসুম। দাউ দাউ করে আগুনের লেলিহান শিখা পুরো জুগ্গি কে ঘিরে ধরেছে—সবাই জল, ঢেলে, মুঠো মুঠো
বালু ছুড়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করছে— ছেলে—রাজকুমার— ঘরে আর ঢুকতেই পারল না
তবাসুম। ওর ঘর কে আগুন গ্রাস করেছে— তবু জোর করে সেই আগুনে ঝাঁপ দিতে সবাই ওকে আটকাতে
ও জ্ঞান হারিয়েছিল।
শিউরে উঠল পুনম। এবার পুনম জোরে কেঁদে উঠল। তবাসুম হাসল।
"দিদি এখন,তোমার চোখে জল—কিন্ত দেখো—আমার আর কান্না পাচ্ছে না—'
শিউরে উঠল পুনম। এবার পুনম জোরে কেঁদে উঠল। তবাসুম হাসল।
"দিদি এখন,তোমার চোখে জল—কিন্ত দেখো—আমার আর কান্না পাচ্ছে না—'
"তেরা বাচ্চা—'
"আমাদের পাশের ঘরের কাকা আমার ছেলেকে বের করে আনল—অনেক টা পুড়ে গেছে— তবে বেঁচে ছিল—। কারা যেন ওকে কোন হাসপাতালে
নিয়ে গেছে জানি না—
আমি কেমন পাগলের মত একটা জ্বলন্ত আগুনের
ডান্ডা নিয়ে ওই— যারা আমার অমিত কে মেরে
ফেলেছে— ওদের দিকে তেড়ে গেলাম।
"তুম লোগোনে অমিত কো মারা— তুম লোগোনে হমারা
জুগ্গি মেঁ আগ লগায়া—'
"আমাদের সব কাগজপত্র পুড়ে ছাই হয়ে গেল দিদি— ওরা অনুপ্রবেশকারী বলে আমাকে নিয়ে
এলো এই তিহার জেলে— আমি জানি না আমার রাজকুমার বেঁচে আছে কিনা— কোথায় আছে—'
অন্ধকার রাতে লোহার গরাদ কাঁদে— আর
দুটি নারী কখন যেন কাঁদতে কাঁদতে একসময় ঘুমিয়ে পড়ে—
এখন ঘন তমিস্রা— ভোরের আগেই অন্ধকার বড় তীব্র হয়—।