বিদ্যা, শিক্ষা এবং তার প্রয়োগ
Published by সুব্রত চৌধুরী in প্রথম পর্ব, দ্বিতীয় সংখ্যা, অক্টোবর ২০২৫ · Friday 31 Oct 2025 · 4:45
Tags: প্রবন্ধ
Tags: প্রবন্ধ
বিদ্যা, শিক্ষা এবং তার প্রয়োগ
সুব্রত চৌধুরী
আধুনিক বিশ্বের দ্রুত পরিবর্তনের সাথে সাথে শিক্ষার ধারণা ও উদ্দেশ্যেও এসেছে নানা
পরিবর্তন। অতীতে শিক্ষা ছিল মূলত পাঠ্যবিষয় বোঝা, মুখস্থ করা এবং পরীক্ষায় উত্তীর্ণ
হওয়াকে কেন্দ্র করে। কিন্তু বর্তমান বিশ্বের শিক্ষা শুধু জ্ঞান নয়, বরং দক্ষতা, সৃজনশীলতা,
প্রযুক্তিতে সক্ষমতা এবং পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা গড়ে তোলার মাধ্যম।
শিক্ষার অন্যতম লক্ষ্য হলো মানুষকে এমনভাবে প্রস্তুত করা, যাতে সে সমাজ ও রাষ্ট্রের
দায়িত্বশীল সদস্য হিসেবে পরিণত হতে পারে এবং নিজের জীবনকে অর্থবহ করে তুলতে পারে। বর্তমান
সময়ের শিক্ষা ব্যবস্থা আগের তুলনায় প্রযুক্তিনির্ভর ও বহুমাত্রিক। ডিজিটাল বিপ্লব সম্পূর্ণভাবে
শিক্ষার ধরণ পরিবর্তন করে দিয়েছে। অনলাইন ক্লাস, ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম— এসব আজ শিক্ষার
পরিচিত উপাদান। প্রযুক্তির ব্যবহারে শিক্ষার বিস্তার এবং সুযোগ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায়
অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। শিক্ষার্থীরা বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের জ্ঞান নিজেদের কাছে সহজেই
পেয়ে যেতে পারে। একসময় যেখানে পাঠ্যবই এবং শ্রেণিকক্ষই ছিল শিক্ষার প্রধান উৎস, এখন
সেখানে প্রযুক্তিই হয়ে উঠেছে বিস্তৃত জ্ঞানভাণ্ডারের দরজা। কিন্তু তারপরও আমাদের মনে
প্রশ্ন জাগে আসলে শিক্ষা বলতে কী বোঝায়?
আমাদের উপনিষদে
শিক্ষা বা বিদ্যার সংজ্ঞায় বলা হয়েছে "যা বিদ্যা য়া বিমুক্ত য়ে’। এটাই
"বিদ্যা’ যা অবিদ্যা বা
অজ্ঞানতার অন্ধকার থেকে মুক্তি দেয়। আবার উপনিষদেরই আরেকটা সঙ্গায় বলা হয়েছে "দ্বে
বিদ্যে- পরা চ, অপরা চঃ’। "পরা’ অর্থে
স্বয়ং স্থিত আত্মতত্ত্ব মূল্যবোধের শিক্ষা, অন্তর্নিহিত
শক্তিকে জাগ্রত করার শিক্ষা। আর "অপরা’ অর্থে- বিভিন্ন
বিষয় বা শাস্ত্রীয় জ্ঞান। যা "অবিদ্যা’কে বলা হয়েছে।
"পরা’- বিদ্যাটা অধ্যবসায়ের দ্বারা অর্জন করতে
হয়, আর ‘অপরা’
বিদ্যাটা হলো বিশেষ কিছু ইনফরমেশন যা আরোপিত বা শেখানো হয়। বিদ্যায়তনিক বা
প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যা যা শুধুই নামের পেছনে যুক্ত করা ডিগ্রি সমূহ।
গুরুদেব
রবীন্দ্রনাথের ভাষায়- "বিদ্যা সহজ, শিক্ষা কঠিন। বিদ্যা
আভরন শিক্ষা আচরণ’। বাস্তবিকই, শিক্ষা মানে
"বিহেভিয়ারেল চেঞ্জ’ বা আচরণগত
পরিবর্তন।
জন্ম থেকে যেমন
কেউই "মানুষ’ হয়ে
জন্মায় না। বড় হওয়ার সাথে সাথে, অধ্যয়নের অধ্যবসায়ে, শিক্ষার অর্জনে, ভেতরে থাকা অবদমিত
পাশবিক প্রবৃত্তিগুলোকে শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধের শক্তিতে পরাজিত করে, অন্তর্নিহিত
শক্তির বিকাশ সাধন করে, মনুষ্যত্বের উন্মোচনের কাজটাই করে দেয় "শিক্ষা’।
অবিদ্যার অজ্ঞতা থেকে মুক্তি দায়ী আত্মোপলব্ধির জ্ঞান অর্জন করে আত্মশক্তিকে
চিনতে শেখায় "শিক্ষা’, যা
চিরন্তন। শিক্ষার অনুপম একটি, পরিচিত সংজ্ঞা দিয়েছেন স্বামীজি-
“এডুকেশন
ইজ দ্যা মেনিফেস্টেশান ওব পারফেকশান হুইচ ইজ ওলরেডী ইন দ্যা ম্যান।”
তিনি আরও
বলেছেন "প্রকৃত শিক্ষা হচ্ছে তাই, যা মানব প্রকৃতির
অজ্ঞান আবরণ উন্মোচন করে (শিক্ষার্থীর) আত্মশক্তির পূর্ণতা বিকাশের সহায়ক হয়।’
আরেকজন
মহাজ্ঞানী মহাজন, যিনি স্বামীজীর পর বিশ্বধর্মসভার আরেকটি অধিবেশনে, ভারতীয় সভ্যতা
সংস্কৃতি, বৈদিক
শিক্ষা ও মানবতার জয়গান গেয়ে, দ্বিতীয়বার বিশ্ববাসীকে বিস্ময়ে মুগ্ধ করেছিলেন, পন্ডিত প্রবর
শ্রীমৎ মহানামব্রত ব্রহ্মচারী (স্বর্ণপদক প্রাপ্ত ট্রিপল এম এ)। এই সর্বত্যাগী
সন্ন্যাসী, কেবলই
একজন আধ্যাত্মিক গুরু ছিলেন না, ছিলেন একজন আদর্শ আচার্য শিক্ষাবিদ সমাজ সংস্কারক, মানবতাবাদী
চিন্তানায়ক,
দার্শনিক মহানামব্রত। তিনি নিজেও ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দের ধর্মভাবনা, জীবনদর্শন, শিক্ষাভাবনা, মানবতাবাদের উত্তরসূরি।
তাঁর
শিক্ষাভাবনায়ও ছিল "পরিপূর্ণ মানুষ হয়ে উঠা’ এবং
"মানুষ হওয়ার প্রাথমিক শর্ত স্বরূপ, শিক্ষাক্রমের অর্জন হিসেবে পাঁচটি গুণ আয়ত্ত্ব করার কথা বলেছেন। তাঁর কথায়
সেই পাঁচটি গুণ হলো ১) সত্যবাদিতা (ট্রুথফুলনেস), ২) অহিংসা (নন্ ভায়োলেন্স এন্ড
লাভ), ৩) অচৌর্য
(নট স্টিলিং ওর গ্রাসপিং আদার্স), ৪) সংযম (সেন্স অফ কন্ট্রোল ওর কনটেন্টমেন্ট),
এবং ৫) শৌচ (পিউরিটি ওব বডি, মাইন্ড এন্ড সৌল)। এটাই প্রাচীন ভারতীয় শিক্ষা, মূল্যবোধের
শিক্ষা।
যে মিথ্যার
আশ্রয় নেয় না,
যে অসভ্য আচরণ করে না, যে তার যোগ্যতার চেয়ে বেশি পাওয়ার প্রত্যাশা ও লোভ
করেনা, যার
চরিত্র সংযত ও সত্যনিষ্ঠ। তাঁর শিক্ষাভাবনা এই গুণাবলী অর্জনের প্রক্রিয়াটাই
শিক্ষা। যথার্থ শিক্ষিত তো তারাই যারা উন্নত মানবিক গুণাবলী ধারন করেন। মানুষের কল্যাণে, সেবায়, সতত প্রয়াস
থাকে। পৃথিবীর যত প্রতিষ্ঠান আছে, অনুষ্ঠান আছে, তাদের সকলেরই
মূল উদ্দেশ্য মানুষকে প্রকৃত "মানুষ’ রূপে
গড়ে তোলা, নৃশংস ধ্বংসকারী রূপে কখনোই নয়।
সাম্রাজ্যবাদী
ইংরেজদের শাসন
ক্ষমতা কায়েম রাখার জন্য প্রয়োজন ছিল, ভারতীয় মূল্যবোধের শিক্ষার জায়গাটাকে
পঙ্গু করে দিয়ে
তাদের সুবিধেমতোন অধস্তন কিছু কেরানী তৈরি করে দেওয়ার জন্য একটা
শিক্ষাব্যবস্থা। জন ম্যাকলে সেই উদ্দেশ্য নিয়েই "মাছি মারা কেরানী’ তৈরি করা সেই
ব্যবস্থাটাকে স্বাধীনতার পরপরই, রাতারাতি পাল্টে দেওয়া সম্ভব ছিল না। তবু দার্শনিক
পন্ডিত ড. রাধাকৃষ্ণানের সভাপতিত্বে বহুভাষিক, বহুজাতিক, দীর্ঘ দিন ধরে
দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ, সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত ভারতবাসীর জন্য যথোপোযুক্ত, সুদূরপ্রসারী
একটি শিক্ষা নীতি প্রবর্তন করা সম্ভব ছিল না। তবু ড. রাধাকৃষ্ণানের
"শিক্ষা নীতি’ টাকেই অনুসরণ করে বার কয়েক বিভিন্ন
এডুকেশন কমিশান গঠিত হয়েছে। যা শুধু শিক্ষা কার্যক্রমকেই অদল বদল করেছে। কিন্তু নালন্দা, তক্ষশীলা, উজ্জয়িনী, মহাস্থানগড়ের
মতো ঐতিহ্যশালী সুপ্রাচীন
বিশ্বসেরা ভারতীয় মূল্যবোধে ও সংস্কৃতির শিক্ষা ব্যবস্থা যা প্রকৃত
মানুষ গড়ে দিতে পারে, সেই লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্যটাই শিক্ষা কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত
করা যায়নি।
শিক্ষা
ব্যবস্থার সেই পরিকাঠামোর মধ্যেই তো এমনতরো চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় অনুমোদন পেলো, যেখান থেকে
চিকিৎসা সেবার সর্বোচ্চ ডিগ্রি ধারীরা, নৃশংসতা, বর্বরতার
দীক্ষা পেলো। যেখানে নিজের জন্মভূমি ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার পাঠ তো শিক্ষার
প্রাথমিক শর্ত হওয়ার কথা।
নতুন
শিক্ষানীতি ২০২০ নিয়ে অনেকেই এটাকে "গৈরিক শিক্ষা নীতি’ বলে
কটাক্ষ, সমালোচনা
করছেন। হ্যাঁ,
সমালোচনার সে সুযোগ ও জায়গা অবশ্যই আছে। কিন্তু যারা নতুন শিক্ষানীতি
নিয়ে একটু আধটু চর্চা করছেন, দেখবেন এই নূতন শিক্ষা নীতিতে যেমন মানবিক মূল্যবোধের
শিক্ষার কথা বলা হয়েছে, তেমনি আছে অর্জিত বিদ্যার সাথে শিক্ষার, প্রয়োগের কথা।
বিদ্যার সাথে শিক্ষার সংযোগ, শিক্ষার সাথে মনের সংযোগ, মনের সাথে চরিত্রের
সংযোগ, চরিত্রের সাথে
আচরনের সংযোগ। "যথার্থ-পূর্ণমানুষ’ হয়ে
গড়ে উঠাই হোক,
আমাদের লক্ষ্য। তাই উপসংহারে বলা যায়, ১৫০বছর পূর্ণ হওয়া ঋষি বঙ্কিমের
ধ্যান লব্ধ মন্ত্রে যা ব্রিটিশ শক্তির হৃদপিন্ডে কাঁপন ধরিয়ে দিয়ে ছিল, জাতির ঐক্য
সাধনের অমোঘ মহামন্ত্র- "বন্দেমাতরম’।